দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিয়ের পাত্রী না পেয়ে ভারতের এক জেলাতেই ২৯ যুবক আত্মহত্যা করেছেন। মহারাষ্ট্র পুলিশ জানিয়েছে, রাজ্যের জলগাঁও জেলায় বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩৮৩ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন । এর মধ্যে ২৯টি এমন ঘটনা রয়েছে, যেখানে আত্মহত্যার কারণ বিয়ের জন্য পাত্রী না পাওয়া।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া মহারাষ্ট্র পুলিশের এই পরিসংখ্যানে আত্মহত্যার নেপথ্যে থাকা কারণের মধ্যে মাদকের প্রতি আসক্তি, হতাশা, পারিবারিক সমস্যা এবং ঋণের মতো নানা বিষয় উঠে এসেছে। এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসার পর জলগাঁওয়ে বিয়ের জন্য পাত্রী না পাওয়ার বিষয়টা নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে।
‘ঠিক বয়সে বিয়ে হওয়া দরকার’
জলগাঁওয়ে কথা হয় বছর তিরিশের বিশাল পাতিলের সঙ্গে। তিনি পেশায় অধ্যাপক। বিয়ে প্রসঙ্গে বিশাল বলেন, আমার বাবা-মাও চেয়েছিলেন আমি বিয়ে করি। তবে, আমি এটি পিছিয়ে দিচ্ছি। আমি আমার ক্যারিয়ারে মনোনিবেশ করতে চাই এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চাই। আমি তখনই বিয়ে করব যখন আমি এমন এক নারীকে খুঁজে পাব যে আমাকে বুঝবে এবং আমার জন্য উপযুক্ত হবে।
সমাজ বিয়ের জন্য কীভাবে একটি বিশেষ বয়স বেঁধে দিয়েছে, সে বিষয়েও কথা বলেন বিশাল পাতিল। তিনি বলেন, ভারতীয় সমাজে আশা করা হয় ২৪-২৬ বছর বয়সের মধ্যে বা কমপক্ষে ২৮-২৯ বছরের মধ্যে একজনের বিয়ে হয়ে যাওয়া উচিত। কারও বয়স ৩০ বছর পেরিয়ে গেলে, তাকে লোকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করে। এই চাপ শুধু বিয়ে না করার জন্য নয়। ধীরে ধীরে, এই ধারণাও তৈরি হতে পারে যেহেতু ওই ব্যক্তির এখনো বিয়ে হয়নি তাই তার মধ্যেই কিছু খামতি রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুকেশ ব্যাখ্যা করেছেন, যখন বিয়ের সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা এবং সাফল্যের মতো বিষয়গুলো জুড়ে যায়, তখন অবিবাহিত তরুণদের মধ্যে অনেকেই বিয়ে না হওয়াকে নিজের বিফলতা বলে মনে করেন।
সাম্প্রতিক আত্মহত্যার ঘটনা সম্পর্কে জলগাঁও পুলিশ যে পরিসংখ্যান দিয়েছে তা খতিয়ে দেখার সময়ে এই বিষয়টাও মাথায় রাখা দরকার।
এই ২৯ আত্মহত্যার ঘটনায় কারণ হিসেবে বিয়ের কথা উল্লেখ করা হলেও এটাই একমাত্র কারণ নয় বলে মনে করছে পুলিশ। মাদকাসক্তি, হতাশা, পারিবারিক চাপ এবং ঋণের মতো অন্যান্য কারণও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বেশি
মহারাষ্ট্রের এই পরিসংখ্যান একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করে। ২০১৯-২০২১ সালের ন্যাশানাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের (এনএফএইচ- ফাইভ) তথ্য অনুসারে, মহারাষ্ট্রে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সের প্রায় ১১ শতাংশ নারী অবিবাহিত। পুরুষের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা ৩০ শতাংশ।
অর্থাৎ ওই রাজ্যে অবিবাহিত পুরুষদের সংখ্যা নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কিন্তু নারীর সংখ্যা কম থাকাটাই কি এই পার্থক্যের একমাত্র কারণ?
জলগাঁওয়ের কৌস্তুভ পোটদারের ঘটনা এই সমস্যার গুরুতর দিকটা তুলে ধরে।
বি ফার্ম ডিগ্রি লাভ করার পর তিনি নাসিকের একটা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন। মায়ের মৃত্যুর পর বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজার কাজ শুরু করে তার পরিবার। কিন্তু নিজের বাড়ি বা সরকারি চাকরি না থাকায় বিভিন্ন পাত্রী পক্ষের কাছ থেকে বারবার ‘না’ শুনতে হয় তাকে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আত্মহত্যা করেন তিনি। তবে কৌস্তুভ পোটদারের ঘটনা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট নয় যে প্রতিবারই এই একটা কারণেই বিয়ের সম্বন্ধে না শুনতে হয় পাত্রপক্ষকে। তবে তার ঘটনা এটা তুলে ধরে যে বিয়ের ব্যাপারে পুরুষদের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং পারিবারিক কাঠামোর মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
‘পাকা বাড়ি বানালে তবেই পাত্রী পাব’
জলগাঁওয়ে এক প্রবীণ নারী জানান, তার ছেলের বয়স এখন ৪০ বছর। তিনি বহু বছর ধরে ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজছেন। পাত্রীপক্ষের কাছে বারবার ‘না’ শোনার পর তিনি এখন নিজেই একটা পাকা বাড়ি বানাচ্ছেন। তার একটাই আশা, ‘বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে (ছেলের জন্য) পাত্রী পাব।’
ছেলে অবিবাহিত থাকা নিয়ে তার উদ্বেগ ছিল বটে, তবে সেটা ছাপিয়ে একটা অসহায় ভাব ফুটে উঠছিল তার কথায়। কারণটা সম্ভবত, বছরের পর বছর চেষ্টা করেও পরিস্থিতি যে বদলাচ্ছে না!
মহারাষ্ট্রের গ্রামাঞ্চল নিয়ে গবেষণা করছেন ময়ূর কুডুপলে এবং জোয়েল কাবালিয়ান। তাদের গবেষণা থেকেও এই বদলের প্রতিফলন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাদের গবেষণা বলছে, গ্রামে বিয়ের ক্ষেত্রে নারীদের পছন্দকে প্রভাবিত করে যে বিষয়গুলো তার মধ্যে রয়েছে- জমি, শিক্ষা, জাতি ও পাত্রের বয়স।
ময়ূর কুডুপলের কথায়, একটা সময় ছিল যখন মেয়ের বাবা খতিয়ে দেখতেন পাত্র কতটা জমির মালিক। এখন জমির চেয়ে তার চাকরি আছে কি না সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‘গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতি বদলেছে, কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা সমানভাবে বদলায়নি। এক সময়ে জমিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষণ বলে ধরা হতো। এখন তার পরিবর্তে নিয়মিত আয়, কর্মসংস্থান, শহরে বসবাসের সম্ভাবনা এবং নিজস্ব বাড়ি থাকার মতো বিষয় এসেছে।’ তথ্যসূত্র: বিবিসি
কেএম