কৃষির ১১ প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগ আটকে দিলেন কৃষিমন্ত্রী
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) চলমান ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের অগ্রগতি ও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন না করেই নতুন পিডির নাম প্রস্তাব এবং প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এ উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি জানতে পেরে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রস্তাবটি স্থগিত করেছেন বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি ডিএইর আওতায় বাস্তবায়নাধীন ১১টি প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য নতুন পরিচালক হিসেবে তিনজন করে কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বর্তমান পিডিদের কেন পরিবর্তন করা হবে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি না কিংবা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সন্তোষজনক কি না, এসব বিষয়ে প্রস্তাবনায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগে থেকে সভার নোটিশ না দিয়ে গত রোববার পিডি পরিবর্তন নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি জুম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সচিব মো. সেলিম খান। সভায় বর্তমান প্রকল্প পরিচালকদের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর দ্রুত এ বিষয়ে ফাইল তৈরি করে কৃষিমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরদিনই মন্ত্রী প্রস্তাবটি আটকে দেন।সভায় অংশ নেওয়া মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, চাকরি জীবনে একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের এমন প্রক্রিয়া তিনি দেখেননি। সাধারণত কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে, পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে কিংবা প্রশাসনিক কারণে পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। এরপর নতুন পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জীবনবৃত্তান্ত, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত দক্ষতা ও কর্মসম্পাদন যাচাই করা হয়।ওই কর্মকর্তা বলেন, এবার হঠাৎ করে জুম সভা করে পিডি পরিবর্তনের ফাইল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সভায় নতুন যেসব কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। একইভাবে বর্তমান পিডিদের পরিবর্তনের কারণ, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি না, সেসব বিষয়ও যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে তিনি দাবি করেন।তার দাবি, সভাটিতে আগে থেকে তৈরি একটি তালিকাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতাসহ দুই ব্যক্তি কৃষি সচিবের কক্ষে গিয়ে একটি তালিকা দেন এবং পিডি পরিবর্তনের জন্য চাপ দেন। এরপর জুম সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং মন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়। পরে কৃষিমন্ত্রী প্রস্তাবনায় অসংগতি দেখতে পেয়ে তা আটকে দেন।ডিএই থেকে পাঠানো তালিকায় পার্টনার, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিভনেস, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন, ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন, মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন ভালনারেবল ল্যান্ডস্ক্যাপস ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, মাশরুম প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগের তালিকায় প্রথমে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি বদলি হয়ে রংপুরে যাওয়া মো. আকলিমুজ্জামানকে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি করার সুপারিশ করা হয়েছে। আর ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার প্রকল্পের পিডি হিসেবে অন্য একটি প্রকল্পে কর্মরত উপপ্রকল্প পরিচালক এম এম আব্দুর রাজ্জাকের নাম সুপারিশ করা হয়েছে।ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান পিডি আব্দুল কায়ূম মজুমদারকে পরিবর্তন করে বান্দরবানে দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আব্দুল গফফারকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, গফফার ২০১৭ সালে আর্থিক অনিয়মের কারণে শাস্তি পেয়েছিলেন। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়ার আবেদনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন না করার এবং বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর জাল করে আবেদন জমা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিভনেস প্রকল্পের ডিএই উইংয়ের পরিচালকের জন্য গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আবুল বাসার মিয়ার নাম সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি ওই প্রকল্পের বর্তমান মনিটরিং কর্মকর্তা ও উপপ্রকল্প পরিচালকের চেয়ে জুনিয়র। এ ছাড়া তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।পিডি পরিবর্তনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক পদে পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তির কথা বলা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই করা সম্ভব হয়নি।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, একজন প্রকল্প পরিচালকের ওপর প্রকল্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, দরপত্র ও ক্রয় কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের কাজ তদারক এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনের দায়িত্ব থাকে। তাই পিডি নিয়োগের আগে শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের পিডি পরিবর্তনের প্রস্তাব আসায় কৃষিমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং এর বাস্তবায়ন স্থগিতের নির্দেশ দেন। তবে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই শেষে এসব প্রকল্পে পিডি পরিবর্তন করা হবে কি না, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।একাধিকবার চেষ্টার পরও কৃষি সচিব মো. সেলিম খান ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ-এর কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমএম/