দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো অভিবাসীর সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়েছে। ২০১৮ সালে এ ধরনের যাত্রার হিসাব রাখা শুরু হওয়ার পর এটিই প্রথমবার এমন মাইলফলক স্পর্শ করল দেশটি।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, শুক্রবার (৯ মে) ৭০ জন অভিবাসী একটি নৌকায় করে দেশটিতে পৌঁছেছেন। এর মধ্য দিয়ে গত নয় বছরে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো মানুষের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৩ জনে।
শান্ত আবহাওয়ার সুযোগে শুক্রবার একটি নৌকাতেই ৭০ জন অভিবাসী চ্যানেল অতিক্রম করতে সক্ষম হন।
ক্রমাগত সরকার পরিবর্তন হলেও এই রুটে অভিবাসী প্রবেশ কমানো এবং মানবপাচারকারী চক্র বন্ধের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। বরং গত তিন বছরে ছোট নৌকায় আগত অভিবাসীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও ফরাসি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, চলতি বছর চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে অন্তত আটজন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৩।
২০১৮ সালে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে শুরু করলে যুক্তরাজ্য সরকার এটিকে ‘মেজর ইনসিডেন্ট’ ঘোষণা করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার, অন্যান্য অবৈধ রুটে কড়াকড়ি এবং সংঘবদ্ধ পাচারচক্রের বিস্তার ছোট নৌকায় অভিবাসন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সরকার আরও বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনুকূল আবহাওয়ার ‘রেড ডে’ বেড়েছে এবং অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কনজারভেটিভ সরকারের আমলে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার মানুষ এই পথে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক ২০২২ সালে ‘স্টপ দ্য বোটস’ স্লোগান দিয়েছিলেন। পরে ২০২৪ সালে ক্ষমতায় এসে লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার মানবপাচারকারী চক্র ‘গুঁড়িয়ে দেওয়ার’ অঙ্গীকার করেন।
এরপরও ৭২ হাজারের বেশি মানুষ ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন। এদের বেশিরভাগই ফ্রান্স থেকে এসে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদন করেন, যদিও সবাই আশ্রয় পান না।
২০২২ সালে এই পথে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ যুক্তরাজ্যে পৌঁছান। পরের বছর কিছুটা কমলেও গত তিন বছর ধরে সংখ্যা প্রায় একই মাত্রায় রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৩৮০ জন চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কম।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, সরকার ছোট নৌকায় অভিবাসন ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রান্সের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছেন, যাতে সমুদ্রসৈকতে নজরদারি বাড়ানো এবং মানবপাচারকারীদের কারাগারে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
সরকারের দাবি, নির্বাচনের পর থেকে যৌথ অভিযানে ৪২ হাজারের বেশি অবৈধ অভিবাসীকে চ্যানেল পার হওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে অবস্থানকারী প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ছোট নৌকায় আসা অধিকাংশ অভিবাসী ছিলেন ইরান, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরিত্রিয়া ও আলবেনিয়ার নাগরিক।
তবে গত এক বছরে কয়েকটি আফ্রিকান দেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া ও ইথিওপিয়া থেকে আগত অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়ে ১৩ হাজারে পৌঁছেছে। একই সময়ে সুদান থেকে আসা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। চলমান গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নকে এর কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সও ভূমধ্যসাগরীয় রুটে একই আফ্রিকান দেশগুলো থেকে সমুদ্রপথে অভিবাসন বৃদ্ধির তথ্য দিয়েছে।
২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ছোট নৌকায় আসা প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। এরা মোট আশ্রয়প্রার্থীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব আবেদনের মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজারের বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় প্রতি পাঁচজনের তিনজন আশ্রয় পেয়েছেন।
তবে আশ্রয় অনুমোদনের হার দেশভেদে ভিন্ন। ইয়েমেন, সুদান ও ইরিত্রিয়া থেকে আসা আবেদনকারীদের ৯০ শতাংশের বেশি আশ্রয় পেয়েছেন।
আফগান আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বদলেছে। ২০২২ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর ৯৬ শতাংশ আবেদন অনুমোদিত হলেও ২০২৫ সালে তা কমে ৩৩ শতাংশে নেমে আসে। কারণ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আফগানিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগের মতো গুরুতর নয় বলে নতুন নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
যাদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, তাদের অনেককে স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে ছোট নৌকায় আসা প্রায় ৭ হাজার ৬০০ মানুষকে যুক্তরাজ্য থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এদের প্রায় ৭০ শতাংশই আলবেনিয়ার নাগরিক।
তবে বর্তমানে আফগানিস্তানে কোনো কূটনৈতিক মিশন না থাকায় দেশটিতে ফেরত পাঠানো সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে যুক্তরাজ্য সরকার।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/