দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি জোরদারের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার দ্বারপ্রান্তে, এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এই প্রথম অঞ্চলটিতে এত বড় আকারে মার্কিন বিমান ও নৌক্ষমতা সমাবেশ দেখা যাচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলও হতে পারে। উপসাগরীয় আরব মিত্ররাও সম্ভাব্য মার্কিন হামলার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি নিয়ে সতর্ক করেছে। তবু আলোচনা ব্যর্থ হলে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার নির্দেশ দিলে কী ঘটতে পারে—তা নিয়ে সাতটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), বাসিজ বাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও পারমাণবিক স্থাপনায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালাতে পারে। এতে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কম হতে পারে। এই হামলার ফলে দুর্বল সরকার ভেঙে পড়ে এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটে—এমন আশাবাদী ধারণাও রয়েছে। তবে ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা বলছে, স্বৈরশাসনের পতনের পর দীর্ঘ অস্থিরতা ও রক্তপাত দেখা দিয়েছে।
এই মডেলকে অনেকে “ভেনেজুয়েলা মডেল” বলেন। এতে সরকার টিকে থাকলেও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের প্রতি সমর্থন কমাতে, ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন শিথিল করতে বাধ্য হতে পারে। তবে ৪৭ বছর ধরে পরিবর্তন প্রতিরোধ করে আসা ইসলামিক রিপাবলিকের নেতৃত্ব, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি—এর অবস্থান বিবেচনায় এই সম্ভাবনা দুর্বল বলেই মনে করছেন অনেকে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে এটি তুলনামূলক বেশি সম্ভাব্য। সরকারবিরোধী অসন্তোষ থাকলেও আইআরজিসি-নির্ভর শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো বিদ্যমান। মার্কিন হামলার পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত একটি সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করতে পারে।
ইরান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে হামলা হলে জবাব দেওয়া হবে। তাদের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বড় ভাণ্ডার রয়েছে, যা ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিতে লুকানো। বাহরাইন, কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। ইরান চাইলে জর্ডান বা ইসরায়েলের মতো দেশকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো স্থাপনায় হামলার ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে।
ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় যেমনটি হয়েছিল, তেমনি হরমুজ প্রণালীতে নৌ-মাইন পেতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে ইরান। বিশ্বের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাময়িকভাবে প্রণালী বন্ধের সাম্প্রতিক মহড়া ছিল শক্তির প্রতীকী প্রদর্শন। এমন পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাজারে বড় ধাক্কা দেবে, যদিও এতে ইরান নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইরানের ‘সোয়ার্ম অ্যাটাক’ কৌশল—অর্থাৎ বিপুল ড্রোন ও দ্রুতগামী নৌকা দিয়ে একযোগে হামলা—মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। অতীতে USS Cole জাহাজে আল-কায়েদার হামলা এবং USS Stark-এ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বর্তমানে USS Gerald R. Ford-সহ দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ অঞ্চলটিতে মোতায়েনের পথে রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দৃশ্যপট হলো—সরকার পতনের পর গৃহযুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত ও ব্যাপক শরণার্থী সংকট। কুর্দি, বালুচি, আজারবাইজানি প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ৯ কোটি ৩০ লাখের বেশি জনসংখ্যার দেশ ইরান বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় ঝুঁকি হলো—যুক্তরাষ্ট্র এত বড় সামরিক শক্তি মোতায়েনের পর ‘পিছু হটার’ সুযোগ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। সিদ্ধান্ত একবার নেওয়া হলে তার ফলাফল হবে অনিশ্চিত ও সুদূরপ্রসারী।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/