দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদারের মধ্যে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় যুদ্ধ প্রস্তুতি জোরদার করছে ইরান। পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে আরও সুরক্ষিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র পুনর্গঠন এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিন্যাসসহ একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে তেহরান।
মঙ্গলবার জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে সাড়ে তিন ঘণ্টার পরোক্ষ বৈঠক হলেও সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান হয়নি। ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাঘচি জানান, উভয় পক্ষ কিছু ‘নির্দেশক নীতিমালায়’ একমত হয়েছে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ধারিত ‘রেড লাইন’ ইরান স্বীকার করেনি।
এদিকে হোয়াইট হাউসকে ব্রিফ করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে বিমান ও নৌবাহিনীর সমাবেশ বাড়ানোর পর সপ্তাহান্তেই যুক্তরাষ্ট্র হামলার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে।
গত জুনে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হন। ১২ দিনের সংঘাতে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে পাল্টা জবাব দেয়। যুক্তরাষ্ট্রও তিনটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, যা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন ট্রাম্প।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খোররামাবাদের ইমাম আলী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিসহ একাধিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করেছে ইরান। তাবরিজ ও হামাদান বিমানঘাঁটির রানওয়ে ও অবকাঠামো মেরামত করা হয়েছে। শাহরুদে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রও দ্রুত পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
মিডলবারি কলেজের গ্লোবাল সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ জেফ্রি লুইস বলেন, ইরান সম্ভবত ইসরায়েলের দাবির চেয়েও দ্রুত তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠন করছে।
নতুন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নাতাঞ্জের কাছে পাহাড়ের ভেতরে নির্মিত ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্সের প্রবেশপথ কংক্রিট ও মাটির স্তর দিয়ে আরও সুরক্ষিত করা হচ্ছে। পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের ‘তালেগান-২’ স্থাপনাও কংক্রিটে ঢেকে পরে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রধান ডেভিড অলব্রাইট সতর্ক করে বলেন, এসব স্থাপনা শিগগিরই শক্ত বাঙ্কারে পরিণত হতে পারে, যা বিমান হামলা থেকে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা দেবে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত ইরানের কমান্ড কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ করে। এরপর সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি–এর নেতৃত্বে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল শক্তিশালী করা হয় এবং যুদ্ধকালীন শাসনের জন্য নতুন ডিফেন্স কাউন্সিল গঠন করা হয়।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)–এর সাবেক কমান্ডার আলি শামখানি–কে ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য মার্কিন ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’—অর্থাৎ শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কায় ইরান এই প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যুদ্ধের আশঙ্কায় ভিন্নমত দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। একই সময়ে পারস্য উপসাগরে নৌমহড়া চালিয়ে হরমুজ প্রণালীর কিছু অংশ সাময়িক বন্ধ রাখে আইআরজিসি। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বে দৈনিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
এ ছাড়া ওমান উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের উত্তরে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ নৌমহড়া চালিয়েছে ইরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও অঞ্চলে দুটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চায় যে সম্ভাব্য যুদ্ধ ব্যয়বহুল হবে এবং হামলার আগে সেই খরচ হিসাব করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও, দুই দেশের অবস্থান যে এখনো মুখোমুখি সংঘাতের ঝুঁকিতে—তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/