দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার মধ্যে সোমবার হোয়াইট হাউসে বৈঠক হতে যাচ্ছে। এ বৈঠককে সিরিয়ার জন্য এক বড় ধরনের কূটনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদ্রোহী থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়া শারা গত বছর দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এরপর থেকেই তিনি সিরিয়ার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করছেন।
সিরিয়ার কোনো প্রেসিডেন্টের এটি হবে প্রথম হোয়াইট হাউস সফর। ছয় মাস আগে সৌদি আরবে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের পর এবার তারা দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠকে বসছেন। এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, শারা আর ‘বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ নন।
৪২ বছর বয়সী শারা গত বছর উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার বিদ্রোহী ঘাঁটি থেকে বিদ্যুৎগতিতে অভিযান চালিয়ে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ৮ ডিসেম্বর বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এরপর থেকে সিরিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে—ইরান ও রাশিয়ার প্রভাব থেকে সরে এসে দেশটি এখন তুরস্ক, উপসাগরীয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।
সোমবারের বৈঠকে নিরাপত্তা ইস্যুই প্রধান আলোচ্য হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে মধ্যস্থতা করছে। একই সঙ্গে ড্যামাস্কাসে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। এছাড়া ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে সিরিয়া যোগ দিতে পারে—যা সোমবারের বৈঠকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হতে পারে।
বৈঠকের আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘সিরিয়া নিয়ে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। আমি মনে করি শারা খুব ভালো কাজ করছেন। কঠিন এলাকায় তিনি দৃঢ়ভাবে টিকে আছেন, এবং তার সঙ্গে আমার সম্পর্কও ভালো।’
গত মে মাসে রিয়াদে ট্রাম্প ও শারার সাক্ষাতের পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। তবে সবচেয়ে কঠোর আইন ‘সিজার স্যাংশন অ্যাক্ট’ প্রত্যাহারে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। হোয়াইট হাউস ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট ২০২৫ সালের মধ্যেই তা তুলে নেওয়ার পক্ষে, যদিও সরকারি অচলাবস্থার কারণে এতে বিলম্ব হতে পারে।
শারা এ বৈঠকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য জোর দাবি তুলবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়বে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে, ১৪ বছরের যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠনে দেশটির ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন। এদিকে সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ২,৫০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন, যা নতুন সরকারের শাসনক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
শারার ব্যক্তিগত জীবনের পরিবর্তনও দেশটির মতোই নাটকীয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক অভিযান চলাকালে তিনি আল-কায়েদায় যোগ দেন এবং কয়েক বছর মার্কিন কারাগারে ছিলেন। পরে সিরিয়ায় ফিরে আসেন ও আসাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করে ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। তবে ২০১৬ সালে তিনি আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় নিজের প্রভাব সুদৃঢ় করেন। গত ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র তার মাথার ওপরের পুরস্কার তুলে নেয়। এক সপ্তাহ আগেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ শারা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও একই সিদ্ধান্ত নেয়।
নিউইয়র্কভিত্তিক ইউরেশিয়া গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরাস মাকসাদ বলেন, ‘ওয়াশিংটন সফর সিরিয়ার বড় রূপান্তরের প্রতীক। একসময় ইরানের প্রভাবে থাকা সিরিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিচ্ছে। আর শারা নিজেও একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী থেকে এখন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশীদার।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবকিছু এখনো অনিশ্চিত, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়েও উদ্বেগ রয়ে গেছে। তবে সিরিয়ার কোনো প্রেসিডেন্টের প্রথমবার ওয়াশিংটন সফর নিঃসন্দেহে আশার বার্তা যে দেশটি সঠিক পথে এগোচ্ছে।’
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/