দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রান্নাঘরে হাঁড়িতে পানি ঢালার দৃশ্যটি এতটাই স্বাভাবিক যে, এ নিয়ে আলাদা করে ভাবার প্রয়োজনই মনে হয় না। ভাত, ডাল কিংবা পাস্তা রান্নার জন্য কল খুলে পানি নেওয়া—দৈনন্দিন জীবনের এই অভ্যাসকে সাধারণত নিরাপদই ধরে নেওয়া হয়। পানি স্বচ্ছ, গন্ধ নেই, আর রান্নার সময় তো ফুটিয়েই নেওয়া হচ্ছে—তাহলে আর সমস্যা কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানেই রয়েছে বড় একটি ভুল ধারণা।
পানি ফুটালে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবীর মতো ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস হতে পারে। কিন্তু পানিতে মিশে থাকা সব ধরনের রাসায়নিক দূষক তাপে দূর হয় না। ফলে দেখতে একেবারে পরিষ্কার এবং রান্নার সময় ভালোভাবে ফুটানো পানিতেও কিছু ক্ষতিকর পদার্থ থেকে যেতে পারে।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, পানি গরম করলে জীবাণু ধ্বংস হতে পারে। তবে ভারি ধাতু ও বিভিন্ন লবণের মতো দূষক ফুটানোর পরও পানিতে থেকে যায়। এর মধ্যে সিসা, আর্সেনিক, ফ্লোরাইড, নাইট্রেট ও শিল্পকারখানার কিছু রাসায়নিক থাকতে পারে।
ইউরেকা ফোর্বসের প্রধান পানি বিজ্ঞানী ড. অনিল কুমার বলেন, ‘পানি ফুটালেই নিরাপদ হয়ে যায়—এমন একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। তাপ ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ধ্বংসে কার্যকর হলেও রাসায়নিক দূষক দূর করে না।’
অর্থাৎ, রান্নার হাঁড়িতে পানি ফুটছে বলেই সেই পানিতে থাকা সব ধরনের দূষণ উধাও হয়ে যাচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়।
বরং কিছু ক্ষেত্রে পানি ফুটানোর পর নির্দিষ্ট কিছু দূষকের ঘনত্ব আরও বেড়ে যেতে পারে। কারণ পানি ফুটতে থাকলে এর একটি অংশ বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। কিন্তু পানিতে দ্রবীভূত রাসায়নিক পদার্থগুলো থেকে যায়। ফলে পানির পরিমাণ কমার সঙ্গে সঙ্গে অবশিষ্ট পানিতে এসব পদার্থের ঘনত্ব বেড়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঠান্ডা পানির তুলনায় গরম পানি সিসা দ্রুত দ্রবীভূত করতে পারে। ফলে গরম পানিতে সিসার মাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এদিকে পানির মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাও। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় পানীয় জলে অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। খালি চোখে দেখা যায় না, স্বাদ বা গন্ধ দিয়েও বোঝা যায় না—এমন এসব কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
তবে এসব তথ্য শুনে একবার কলের পানি দিয়ে ভাত রান্না করলেই বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে—এমনটা বলছেন না বিশেষজ্ঞরা। ঝুঁকির মূল বিষয়টি বরং দীর্ঘদিনের সংস্পর্শ।
ড. অনিল কুমারের ভাষায়, ‘ঝুঁকি একটি খাবারে নয়, বরং একই ঘটনা বারবার ঘটার মধ্যে।’
অর্থাৎ, অল্প পরিমাণ দূষক প্রতিদিন খাবার ও পানির সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে দীর্ঘ সময় পর তার প্রভাব তৈরি হতে পারে। এ কারণেই শুধু পান করার পানি নয়, রান্নায় ব্যবহৃত পানির মানের দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনেক পরিবার পান করার জন্য ফিল্টার করা পানি ব্যবহার করে। কিন্তু একই বাড়িতে রান্নার জন্য সরাসরি কলের পানি ব্যবহার করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানির দূষণ নিয়ে যদি উদ্বেগ থাকে, তাহলে শুধু পান করার পানিই নয়, রান্নার পানির ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা অনুসরণ করা উচিত।
ড. কুমার বলেন, ‘রান্নার পানিকে শুধু একটি ব্যবহারিক উপকরণ হিসেবে নয়, প্রতিদিনের পুষ্টির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ পানির সঙ্গে যা শরীরে প্রবেশ করে, সময়ের সঙ্গে তা শরীর শোষণ করে।’
তাই শুধু পানি স্বচ্ছ কি না, কিংবা রান্নার সময় ফুটছে কি না—এ দুটি বিষয় দেখেই পানিকে নিরাপদ ধরে নেওয়া যথেষ্ট নয়। পানির উৎস ও মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া, প্রয়োজন হলে উপযুক্ত পরিশোধন ব্যবস্থা ব্যবহার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি দূষণের ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়াই হতে পারে নিরাপদ পথ।
/অ