দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতারা গত শুক্রবার মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছেন। চুক্তিতে তিন দেশ যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। পাশাপাশি, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে দেশ তিনটি। বিশেষ করে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার বিস্তার এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই গড়ে উঠেছে নতুন এই সামরিক সমীকরণ।
সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে দেশ তিনটি একত্রে একটি বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচকের তথ্য অনুযায়ী, তিন দেশের সম্মিলিত সক্রিয় সামরিক সদস্য প্রায় ১৪ লাখ, সামরিক উড়োজাহাজ ৩ হাজার ৪১৫টি, ট্যাংক ৬ হাজার ৪৬টি এবং নৌযান ৩৪৪টি।
জনবল ও স্থলবাহিনীর শক্তি
তিন দেশের মধ্যে সক্রিয় সামরিক সদস্য সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানের—৬ লাখ ৬০ হাজার। এরপর তুরস্কের ৪ লাখ ৮১ হাজার এবং সৌদি আরবের ২ লাখ ৪৭ হাজার। তাদের সম্মিলিত সামরিক শক্তিতে প্রায় ৬ হাজার ৪৬টি ট্যাংক ও ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান রয়েছে। পাকিস্তানের ট্যাংক রয়েছে ২ হাজার ৬৭৭টি, তুরস্কের ২ হাজার ২৮৪টি এবং সৌদি আরবের ১ হাজার ৮৫টি।
এ ছাড়া তিন দেশের কাছে হাজার হাজার কামান ও একাধিক রকেট নিক্ষেপ ব্যবস্থা রয়েছে।
আকাশপথে বড় শক্তি
তিন দেশ মিলে ৩ হাজার ৪১৫টি সামরিক উড়োজাহাজ পরিচালনা করে। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, পরিবহন ও প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ রয়েছে।
পাকিস্তানের রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৯৭টি সামরিক উড়োজাহাজ। তুরস্কের ১ হাজার ১০১টি এবং সৌদি আরবের ৯১৭টি।
নৌবাহিনীতেও শক্তিশালী
তিন দেশের সম্মিলিত নৌবহরে রয়েছে ৩৪৪টি নৌযান। এর মধ্যে ৩৩টি ফ্রিগেট, ২৪টি করভেট এবং ২২টি সাবমেরিন রয়েছে।
নৌ সক্ষমতায় এগিয়ে তুরস্ক। দেশটির নৌযান রয়েছে ১৯২টি। এরপর পাকিস্তানের ১২০টি এবং সৌদি আরবের ৩২টি।
প্রতিরক্ষা ব্যয়
তিন দেশের সম্মিলিত বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ১২৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে সৌদি আরব ২০২৬ সালে প্রতিরক্ষা খাতে ৬৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। তুরস্কের বরাদ্দ ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার এবং পাকিস্তানের ৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
কে কী শক্তি দেবে?
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটির বড় শক্তি হলো তিন দেশের সামরিক সক্ষমতার পারস্পরিক পরিপূরকতা।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, সৌদি আরব এই জোটে অর্থ, ভৌগোলিক অবস্থান, অবকাঠামো ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আসছে। তুরস্কের রয়েছে উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, নজরদারি ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা, নৌ ব্যবস্থা এবং ন্যাটোভিত্তিক সামরিক অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে পাকিস্তান দিচ্ছে বড় সামরিক জনবল, পেশাদার সামরিক কাঠামো, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা ও পারমাণবিক শক্তি।
পাকিস্তান বিশ্বের নয়টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের একটি। দেশটি প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় ১৯৯৮ সালে। ২৫ কোটির বেশি জনসংখ্যার পাকিস্তান অস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
তুরস্ক ১৯৫২ সালে ন্যাটোতে যোগ দেয়। দেশটির নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র নেই। তবে ন্যাটোর পারমাণবিক অস্ত্র ভাগাভাগি ব্যবস্থার আওতায় দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
তিন দেশের জন্য চুক্তির গুরুত্ব
সৌদি আরবের জন্য এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য সৌদি আরবের বড় বাজার ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা তাদের নিজস্ব অর্থনীতির চাহিদার তুলনায় বেশি। ফলে সৌদি বাজার তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এই জোটের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা গ্রহণকারী দেশ, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের সবচেয়ে বড় বিদেশি ক্রেতা এবং তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি সামরিক সহযোগিতার নতুন ধারা তৈরি করতে পারে। অতীতে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশগুলো প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করলেও এখন আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের সম্পদ ও সক্ষমতাকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
আর কোন দেশ যোগ দিতে পারে?
এই জোটে সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে মিসরের নাম এসেছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসরকে ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারিগরি বিষয়গুলো সমাধান হলে কায়রো জোটে যোগ দেবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মিসরের সামরিক সক্ষমতা, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ জোটটিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তবে সামরিক বাধ্যবাধকতা এবং বিদ্যমান চুক্তির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে মিসর সতর্ক থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিসরের সহযোগিতা, বিদ্যমান জোট ও শান্তিচুক্তি এবং কখন ও কোথায় সামরিকভাবে অংশ নেবে—সে বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নিশ্চিত হলেই দেশটি এই জোটে যোগ দিতে আগ্রহী হতে পারে।
/অ