দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।
শুক্রবার সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় চুক্তিতে সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তির মূল বিষয় হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিন দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামী সংহতি এবং অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতেই চুক্তিটি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করা।
চুক্তির এক দিন আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শক্তিশালী সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছান এবং মক্কায় ওমরাহ পালন করেন। শুক্রবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করতে সৌদি আরব সফর করেন এরদোয়ানও।
কেন এখন এই চুক্তি?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যে সেই আলোচনা আরও গতি পায়।
তুরস্ক ও পাকিস্তান এখন পর্যন্ত সরাসরি আঞ্চলিক সংঘাতে আক্রান্ত না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোর উপস্থিতি থাকা সৌদি আরব ইরান ও ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথিদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা থাকা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানেও হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ, ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলি হামলা—সব মিলিয়ে তিন দেশই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর অবস্থানে হামলা এবং ইরানপন্থি ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
তুরস্কের কর্মকর্তাদের মতে, আঞ্চলিক উত্তেজনা তিন দেশকে আরও ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করেছে। হরমুজ প্রণালির সংকট, ইরানে হামলা এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া এই প্রয়োজন আরও বাড়িয়েছে।
চলতি বছরের ১৯ মার্চ রিয়াদে ইসলামী সম্মেলনের সময় তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করে সম্ভাব্য যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেন। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব নিজেদের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল।
চুক্তিতে তিন দেশের শক্তি কী?
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী, সৌদি আরব বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক এবং পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।
বিশ্লেষক ওজগুর উনলুহিসারচিকলি বলেন, তিন দেশের সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রভাব এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করবে।
তবে তার মতে, এটি ন্যাটোর মতো পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়। বরং তিন প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে কৌশলগত, সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর একটি কাঠামো।
চুক্তির আওতায় সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ও থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি দেশ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি করে আসা সৌদি আরব নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে তিন দেশ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা ব্যয়, জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে পারে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া কী?
চুক্তি নিয়ে ইরানের নেতৃত্ব এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে ইরানের আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগজে চুক্তি করলেই সৌদি আরব নিরাপত্তা পাবে না, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের একতরফা নির্ভরশীলতাও সৌদিকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি।
ইসরায়েলের জন্য কী বার্তা?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।
তুরস্কের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। এমনকি অন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্যও এতে যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা নিয়ে তিন দেশেরই উদ্বেগ রয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এর আগে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নষ্ট করার চেষ্টা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলারও তিনি ধারাবাহিকভাবে সমালোচনা করেছেন।
পাকিস্তানও গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করেছে এবং তথাকথিত ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ ধারণার বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে পাকিস্তান আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য আব্রাহাম চুক্তিতে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে সৌদি আরব জানিয়েছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পথ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না।
ফলে নতুন এই প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: আল-জাজিরা
/অ