দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হুমকির মুখে সৌদি আরব থেকে এশিয়াগামী দুটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার লোহিত সাগরে দিক পরিবর্তন করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথগুলোতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণার পর ইয়ানবু বন্দর থেকে চীন ও ভারতের উদ্দেশে রওনা হওয়া দুটি ট্যাংকার বাব আল-মান্দেব প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগরে না গিয়ে সুয়েজ খালের দিকে ঘুরে যায়।
সোমবার জাহাজ মালিকদের উদ্দেশে পাঠানো এক বার্তায় হুথিরা জানায়, সৌদি তেল বহন বা খালাস করে—এমন যেকোনো জাহাজকে তারা লক্ষ্যবস্তু করবে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধে নতুন একটি ফ্রন্ট যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, টানা ১১তম রাতেও ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। বুধবার ভোরে তেহরানজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। একই সময়ে রাজধানীর আকাশে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে ইরান। এছাড়া চাবাহার, কোনারাক ও বুশেহরেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে ইরান বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজেও হামলার ঘটনা ঘটে।
ইরান দাবি করেছে, বাহরাইনে অবস্থিত অ্যামাজনের আঞ্চলিক ডেটা সেন্টার-সংক্রান্ত অবকাঠামোতেও তারা হামলা চালিয়েছে। তবে এ দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। অ্যামাজনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুথিরা এখনো বাব আল-মান্দেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তবে তারা এমন পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত তারা তা করেনি। কিন্তু যদি করে, তাহলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।"
ট্রাম্প আরও জানান, এ পর্যন্ত যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে জর্ডান ও ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় চারজন নিহত হন।
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে ইয়ানবু বন্দরে এনে লোহিত সাগর হয়ে রপ্তানি করছিল। তবে হুথিদের হুমকিতে সেই বিকল্প পথও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরবের অধিকাংশ তেল রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে পড়তে পারে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
এ পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে পড়েছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারের ওপরে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দামও আবার গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
সেন্টকম জানিয়েছে, গত দেড় সপ্তাহে তারা ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, নৌ সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন। এর জবাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় অন্তত ৫০ বেসামরিক মানুষ নিহত এবং আরও ৫০০ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটের এক শুনানিতে জানান, ইরান যুদ্ধের ব্যয় ইতোমধ্যে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ৭০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ অনুমোদনেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, একটি তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর নাবিকদের লাইফবোটে আশ্রয় নিতে হয়। অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, প্রণালির দক্ষিণ অংশ দিয়ে চলাচলের সময় দুটি তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সংঘাতের মধ্যেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি থেমে যায়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে ইরানের কাছে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি পাকিস্তর সফর করে ইসলামাবাদকে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/