দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের জলসীমার কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাভুক্ত এলাকায় ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের উপস্থিতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা আরও স্পষ্ট করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ইরানে সবচেয়ে বিস্তৃত ও সহিংস বিক্ষোভ দমনের প্রেক্ষাপটে এই সামরিক মোতায়েন দুই দেশের সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে পৌঁছানোর ঝুঁকি বাড়িয়েছে, যা বহু বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
ইরানের নেতৃত্ব এখন দ্বিমুখী চাপে রয়েছে। একদিকে শাসনব্যবস্থার অবসান চাওয়া ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত ও কঠোর অবস্থান, যা শুধু তেহরান নয়, পুরো অস্থির অঞ্চলে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কোনো সামরিক হামলার জবাব আগের মতো হিসেবি ও সীমিত নাও হতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি এসেছে। ফলে এখন কোনো মার্কিন হামলা দ্রুত ও বিস্তৃত উত্তেজনায় রূপ নেওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান সাধারণত বিলম্বিত ও সীমিত পাল্টা প্রতিক্রিয়ার কৌশল নিয়েছে। ২০২৫ সালের ২১ ও ২২ জুন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরের দিনই তেহরান কাতারের আল উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরান আগাম সতর্কতা দেওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব হয় এবং কোনো হতাহত হয়নি। এটিকে ইরানের দৃঢ়তা দেখানোর পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানোর হিসেবি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল।
একই চিত্র দেখা গিয়েছিল ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। বাগদাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় কুদস ফোর্স কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পাঁচ দিন পর ইরান ইরাকের আইন আল-আসাদ মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সেবারও আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। কেউ নিহত না হলেও বহু মার্কিন সেনা মস্তিষ্কে আঘাতের কথা জানান। তখনও ধারণা ছিল, ইরান উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন।
১৯৭৯ সালের পর থেকে ইরান এখন সবচেয়ে গুরুতর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কঠোর দমন–পীড়নের মুখে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থা ও চিকিৎসাকর্মীদের হিসাবে কয়েক হাজার মানুষ নিহত এবং আরও বহু আহত বা আটক হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ ও প্রবেশাধিকারের অভাবে প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা যাচ্ছে না। সরকার দায় স্বীকার না করে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ ও ইসরায়েলকে দায়ী করছে।
এই বর্ণনা রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়েও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব সম্প্রতি বলেন, এই বিক্ষোভকে গত গ্রীষ্মের ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা উচিত। এতে বোঝা যায়, নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দমন–পীড়নের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
যদিও রাস্তায় বিক্ষোভ কিছুটা কমেছে, তবে অসন্তোষ দূর হয়নি। সমাজের বড় অংশের সঙ্গে শাসনব্যবস্থার দূরত্ব এখনো প্রকট। ৮ ও ৯ জানুয়ারি কয়েকটি শহরে নিরাপত্তা বাহিনী সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল বলেও খবর আসে, যা কর্তৃপক্ষকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। পরবর্তী শান্ত পরিস্থিতি আলোচনার নয়, বরং শক্তি প্রয়োগের ফল।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত হামলা ওয়াশিংটনকে সামরিক সাফল্যের দাবি করতে দিলেও তেহরানকে নতুন দমন–পীড়নের অজুহাত দিতে পারে। আবার বড় পরিসরের অভিযান ইরানকে অস্থিরতার কিনারায় ঠেলে দিতে পারে, যা ৯ কোটির বেশি মানুষের দেশে দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
এই ঝুঁকির কারণেই তেহরান থেকে এখন কঠোর ভাষা শোনা যাচ্ছে। বিপ্লবী গার্ড ও সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, হামলার মাত্রা যাই হোক, তা যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইসরায়েলও তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ট্রাম্পও চাপে রয়েছেন। বিক্ষোভ চলাকালে তিনি ইরানিদের উদ্দেশে বলেছিলেন ‘সহায়তা আসছে’, যা দেশটির ভেতরে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। উভয় পক্ষই জানে, ইরান গত গ্রীষ্মের যুদ্ধের পর সামরিকভাবে দুর্বল, আবার ট্রাম্পও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যেতে চান না। কিন্তু এই পারস্পরিক উপলব্ধি ভুল হিসাবের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ ভারসাম্যের মধ্যে সামান্য ভুল হিসাবই শুধু সরকার নয়, লাখো সাধারণ মানুষ ও পুরো অঞ্চলকে বড় মূল্য দিতে বাধ্য করতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/