দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

৯ মে সর্বশেষ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন নূরুল আমিন। সংক্ষিপ্ত সেই ফোনকলেই তিনি জানতে পারেন—তার ভাই কাইরুলসহ পরিবারের চারজনকে ভারতের সরকার নাকি জোরপূর্বক মিয়ানমারে পাঠিয়ে দিয়েছে। মোট ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ওইদিন ফেরত পাঠানো হয় বলে অভিযোগ। অথচ যে মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের ভয়ে তারা বহু বছর আগে পালিয়ে এসেছিল, সেই দেশ এখন ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটিতে সেনাশাসক জান্তার সঙ্গে জাতিগত মিলিশিয়া ও প্রতিরোধ বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। এই অবস্থায় প্রিয়জনদের আর কোনোদিন দেখতে পারবেন কিনা—সেই আশা প্রায় নেই বললেই চলে, বলছিলেন ২৪ বছরের আমিন।
সমুদ্রে ফেলে দেওয়া ঘটনার তিন মাস পর বিবিসি মিয়ানমারে গিয়ে শরণার্থীদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। তারা জানায়, ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে প্রথমে বিমানে করে বঙ্গোপসাগরের আন্দামান দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। পরে নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে সমুদ্রে নামতে বাধ্য করা হয়।
'আমাদের হাত বেঁধে, চোখ-মুখ ঢেকে বন্দির মতো নৌকায় তোলা হয়। তারপর লাইফ জ্যাকেট দিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়,' ফোনে তার ভাইকে জানিয়েছিল জন নামের এক রোহিঙ্গা।
একই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন সৈয়দ নূর নামের আরেকজন শরণার্থী। বিবিসিকে ভিডিওকলে তিনি বলেন, “আমরা মিয়ানমারে নিরাপদ নই। চারদিকে শুধু যুদ্ধ। এখানে আমাদের জীবন প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে।” তিনি তখন দক্ষিণ-পশ্চিম মিয়ানমারের একটি প্রতিরোধ গোষ্ঠী ‘বা হ্তু আর্মি’র (BHA) আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কথা বলছিলেন।
মারধর, অপমান ও জেরা
শরণার্থীরা জানিয়েছে, জাহাজে প্রায় ১৪ ঘণ্টা রাখা হয়েছিল তাদের। ভারতীয় খাবার দিলেও অনেককে মারধর ও অপমান করা হয়। কারও হাত বাঁশ দিয়ে খোঁচানো হয়েছে, কারও মুখে ঘুষি মারা হয়েছে।
এমনকি তাদের ধর্ম নিয়েও বিদ্রূপ করা হয়। ৪০ জনের মধ্যে অন্তত ১৫ জন খ্রিস্টান। নূরের ভাষায়, 'তারা বলছিল—কেন হিন্দু হলে না? ইসলাম ছেড়ে খ্রিস্টান কেন হলে?' অনেককে জোর করে কাপড় খুলে খতনা আছে কিনা তা-ও দেখা হয়।
ভয়াবহ যাত্রা
৬ মে দিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪০ জন রোহিঙ্গাকে স্থানীয় থানায় ডেকে নেয়া হয় বায়োমেট্রিক ডেটা নেওয়ার কথা বলে। কয়েক ঘণ্টা পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ইন্দরলোক আটককেন্দ্রে। পরদিন হিন্দন বিমানবন্দর থেকে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাঠানো হয়।
শরণার্থীদের দাবি—সেখানে সামরিক পোশাক পরা লোকজন বাসে তুলে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজে নিয়ে যায়। পরদিন ছোট নৌকায় তুলে হাতে লাইফ জ্যাকেট ধরিয়ে বলা হয়, নামতে হবে পানিতে। দড়ি ধরে সাঁতরে উপকূলে পৌঁছালে স্থানীয় জেলেরা তাদের উদ্ধার করে। পরে তারা জানতে পারে, জায়গাটি মিয়ানমারের ভূখণ্ড।
জাতিসংঘের উদ্বেগ
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদক টমাস অ্যান্ড্রুজ বলেন, অভিযোগগুলো প্রমাণের পক্ষে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তিনি জেনেভায় ভারতের মিশনপ্রধানকে বিষয়টি জানিয়েছেন, তবে এখনো কোনো জবাব পাননি। জাতিসংঘের মন্তব্য, ভারত শরণার্থীদের আন্দামান সাগরে ফেলে দিয়ে তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
ভারতের অবস্থান
ভারত রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না; বরং তাদেরকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমানে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় (ইউএনএইচসিআর) নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ভারতে ২৩ হাজার ৮০০ জন। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী আসল সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি।
২০১৭ সালে মিয়ানমারে সেনা অভিযান শুরু হলে লাখো রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালায়। বাংলাদেশের কক্সবাজারে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।
আইনি লড়াই
৯ মে সকালে নূরুল আমিনের ভাই তাকে ফোন করে জানান, মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে এবং ইউএনএইচসিআরকে জানাতে অনুরোধ করেন। পরে আমিন ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন যেন তাদের ফিরিয়ে আনা হয় এবং ভবিষ্যতে এমন বহিষ্কার রোধ করা হয়।
যদিও ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক অভিযোগগুলোকে 'কল্পনাপ্রসূত' বলে মন্তব্য করেছেন। তবে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর আদালতে শুনানি হবে—রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হবে কি না, নাকি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বহিষ্কার করা হবে।
আতঙ্কে রোহিঙ্গা সমাজ
ভারতে বসবাসরত রোহিঙ্গা সমাজের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নূরুল আমিন বলেন, 'আমরা জানি না, কবে সরকার আমাদেরও ধরে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেবে। তাই ঘর ছেড়ে বাইরে বের হতেও ভয় পাচ্ছি।'
জাতিসংঘের অ্যান্ড্রুজ বলেন, 'রোহিঙ্গারা ভারতে এসেছে কারণ তারা মিয়ানমারে মৃত্যুভয় থেকে পালাচ্ছিল। তারা ইচ্ছায় নয়, প্রাণ বাঁচাতেই ভারতে এসেছে।'
এফএইচ/এমএস