দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এ সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছে দুই দেশ। এদিকে, আগামী মাসে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর কথা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
শুক্রবার দুই দেশ জানায়, আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এর ফলে শহরটিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং মানবিক করিডর দিয়ে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সাড়ে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা নভেম্বরের প্রথমার্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকে সম্মত হয়েছেন। পরে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবুধাবি অথবা সুইজারল্যান্ডে তিন দেশের পরবর্তী আলোচনা হতে পারে।
জেলেনস্কি আশা প্রকাশ করেছেন, আলোচনার পর তিন দেশের নেতাদের মধ্যে বৈঠকও অনুষ্ঠিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আগের দফার আলোচনা ফেব্রুয়ারিতে থমকে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত অবসানে ওই আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। রাশিয়া এখনো পূর্বাঞ্চলীয় দনবাসের পুরো এলাকা ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। এর মধ্যে এমন ভূখণ্ডও রয়েছে, যা রুশ বাহিনীর দখলে নেই। অন্যদিকে, বর্তমানে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে কিয়েভ।
সাম্প্রতিক শান্তি উদ্যোগের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। এ সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া বেশ কয়েকটি পদক্ষেপকে রাশিয়ার পক্ষে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে বিরোধের অন্যতম কারণ ইউক্রেনে স্পেসএক্সের স্টারলিংক যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ। রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইউক্রেন। শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, স্টারলিংক নিয়ে ইউক্রেনের এখনো কোনো সমস্যা থাকলে তিনি তা সমাধান করবেন। প্রয়োজনে স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
আরেকটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক বাজারে ডিজেল সরবরাহের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত চুক্তি। জ্বালানির দাম কম রাখার লক্ষ্যে নেওয়া এ উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছে ইউক্রেন। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক জানান, রাশিয়ার ডিজেলবাহী প্রথম তিনটি ট্যাংকার উত্তর আমেরিকার পথে রয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রুশ বাহিনীর দখলে থাকা ওলেশকি শহরের বাসিন্দারা ক্রমবর্ধমান খাদ্যসংকটের কথা জানিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং নির্ধারিত নিরাপদ পথ দিয়ে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে ওলেশকিতে সাময়িকভাবে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের টেলিগ্রাম চ্যানেলে জানান, স্থানীয় সময় ২৭ অক্টোবর ভোর ৪টা (জিএমটি ০১০০) থেকে রুশ সেনারা গোলাবর্ষণ বন্ধ রাখবে। এর মাধ্যমে মানবিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফও একই সময় থেকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ওলেশকির বাসিন্দাদের সহায়তায় সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। ইউক্রেন জানিয়েছে, এরই মধ্যে দুবার ড্রোনের মাধ্যমে শহরটিতে খাবার পাঠানো হয়েছে।
ইউক্রেনের মানবাধিকারবিষয়ক ন্যায়পাল দিমিত্রো লুবিনেৎসও ২৭ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কথা জানিয়েছেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, শহরে যাওয়ার সড়কগুলো থেকে মাইন অপসারণ, খাদ্য সরবরাহ এবং বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হবে এ অভিযানের অংশ।
উভয় পক্ষই এ সমঝোতা সমন্বয়ে মেলানিয়া ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা জানিয়েছে। যুদ্ধের সময় রাশিয়ার হাতে আটক ইউক্রেনীয় শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি।
এক বিবৃতিতে মেলানিয়া বলেন, “ওলেশকি যুদ্ধের সম্মুখসারির একটি শহর, যা বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে।”
তিনি আরও বলেন, “শহরটিতে অবশিষ্ট বাসিন্দাদের অধিকাংশই প্রবীণ। তাঁদের জরুরি চিকিৎসা, ওষুধ, খাবার ও বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন।”
গত সপ্তাহে পোপ লিও ওলেশকির পরিস্থিতি নিয়ে জেলেনস্কি এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেন।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা খেরসন শহরের বিপরীত পাশে দিনিপ্রো নদীর অপর তীরে অবস্থিত ওলেশকিতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার মানুষ রয়েছেন। যুদ্ধের আগে শহরটির জনসংখ্যা ছিল ২৪ হাজার।
শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে জেলেনস্কির বক্তব্য আসে চলতি সপ্তাহের শুরুতে নরওয়েতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর। ওই বৈঠকের পর উইটকফ রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করেন।
জেলেনস্কি জানান, শুক্রবার তিনি উইটকফ ও মার্কিন দূত জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, যেকোনো শান্তিচুক্তিতে ইউক্রেনের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং দেশটির সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণে ১০ বছরের অর্থায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
হাডসন ইনস্টিটিউটের এক অনুষ্ঠানে ভিডিও সংযোগে জেলেনস্কি বলেন, “নভেম্বরের প্রথমার্ধে, অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব, বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।”
তিনি বলেন, আলোচনার অগ্রগতি অনেকটাই রাশিয়ার ওপর নির্ভর করবে। চলতি মাসে একই ধরনের একটি বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা অনুষ্ঠিত হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা ও যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন জেলেনস্কি। যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে আলোচনায় ইউরোপের অংশগ্রহণও প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, ইউক্রেনে স্টারলিংক ব্যবস্থায় গতির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ এখনো বহাল রয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, স্টারলিংক সেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক করা হয়েছে।
শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, বিধিনিষেধ নিয়ে তিনি এখনো মাস্কের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে প্রয়োজন হলে কথা বলবেন।
তিনি বলেন, “কোনো সমস্যা থাকলে আমি তা সমাধান করে দেব।”
১৩ অক্টোবর থেকে স্টারলিংক ব্যবস্থায় এসব বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে।
শুক্রবার রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বন্দিবিনিময়ও হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উভয় পক্ষ ২৭০ জন করে সেনাসদস্য বিনিময় করেছে।
আগস্টের পর এটিই দুই দেশের মধ্যে প্রথম বন্দিবিনিময়। জেলেনস্কি এ ঘটনাকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এদিকে, ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত প্রসিকিউটর আন্তন কোভালস্কি টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, চার বছরের বেশি সময় আগে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১৯ হাজারের বেশি ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭৬২টি শিশু রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/