দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতার এক সপ্তাহ পর শনিবার আবারও দেশজুড়ে বিক্ষোভের আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থী, ট্রেড ইউনিয়ন ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন সংগঠন দ্বিতীয় দফায় এসব বিক্ষোভের আয়োজন করছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিরাপত্তা জোরদারে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। গত ১৭ অক্টোবরের সহিংসতার ব্যাপকতা আগে থেকে আঁচ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখে সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, ‘কোনো কিছুতেই আমরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হলে তা উপেক্ষা করব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাঙচুরকারী, লুটপাটকারী এবং সহিংসতায় জড়িত কারও প্রতিই আমরা নমনীয় হব না।’ নির্ধারিত বিক্ষোভের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র বামপন্থী ও কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে সহিংসতার বহু আহ্বান দেখা গেছে বলেও জানান তিনি।
গত কয়েক দিনে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় কয়েক শ মানুষকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শনিবারের বিক্ষোভের আগে শুক্রবার উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, মাখোঁ তাঁদের কাছে কিছু বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার করেছেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা শিক্ষার্থীদের ‘সংগঠিত হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে মাখোঁ ঘোষণা দেন, শনিবার কেবল স্বীকৃত ট্রেড ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভই অনুষ্ঠিত হতে পারবে। লিওঁ, নিস ও মন্টপেলিয়েসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সব ধরনের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
তবে সরকারি ঘোষণায় বিক্ষোভের আয়োজকদের খুব একটা নিরুৎসাহিত করা যায়নি। ফ্রান্সজুড়ে ছোট-বড় কয়েক শ বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গত এক সপ্তাহে রাজধানীর কয়েকটি এলাকাসহ কিছু শহরে আংশিক কারফিউ জারি ছিল। এরপরও শনিবার কোথায় কী ধরনের বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে, তা নিয়ে শহরভেদে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
কিছু শহরের মেয়র ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও অন্যরা কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছেন। যেমন মার্সেইয়ে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার আগের আদেশ দ্রুত প্রত্যাহার করে ট্রেড ইউনিয়ন আয়োজিত মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
প্যারিসে শিক্ষার্থীদের একটি ট্রেড ইউনিয়নের আয়োজিত মিছিলকে শ্রমিক সংগঠনগুলো সমর্থন দিয়েছে। তবে মিছিলটি শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা এড়িয়ে নির্ধারিত পথে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও শহরের পরিচিত কয়েকটি এলাকায় নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার লুভর, ওর্সে ও পিকাসো জাদুঘর বন্ধ থাকবে। ফুটবল ক্লাব প্যারিস সাঁ জারমাঁর (পিএসজি) নির্ধারিত ঘরোয়া ম্যাচও সোমবারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন করে লুটপাটের আশঙ্কায় কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের দোকানের জানালায় কাঠের পাটাতন লাগিয়েছে।
ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনেও উত্তাল হতে পারে ফ্রান্স
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কীভাবে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, তার আরেকটি উদাহরণ হতে পারে পুনরুজ্জীবিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের অংশগ্রহণ। শনিবার ফ্রান্সজুড়ে এই আন্দোলনের সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যেতে পারে।
মাখোঁর প্রথম মেয়াদে বাম ও ডান—উভয় রাজনৈতিক শিবিরের সমর্থন পাওয়া এই আন্দোলন দেশজুড়ে বড় ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টিকারী বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
আন্দোলনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটে শনিবারের জন্য ৫০০টির বেশি বিক্ষোভ এবং আরও প্রায় ২০০টি কর্মসূচির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাখোঁর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।
অনলাইনে প্রকাশিত আন্দোলনের আহ্বানে বলা হয়েছে, ১৭ অক্টোবরের সহিংসতার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশকারীদের সঙ্গে তারা নিজেদের কণ্ঠ মেলাতে চায় না। বরং তাদের অভিযোগ, পুলিশই বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
গত সপ্তাহের সহিংসতার ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ফ্রান্স। ওই সময় বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গায় অংশ নেওয়া মানুষের তুলনায় পুলিশ সদস্যের সংখ্যা অনেক কম ছিল। বিভিন্ন দোকানে লুটপাট চালানো হয় এবং ভবনে আগুন দেওয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল লিমোজ শহরের ১৯ শতকের ঐতিহ্যবাহী টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়া।
শুক্রবার বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ জানান, ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গায় জড়িত থাকার দায়ে ২৩২ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার ১০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। এসব মামলার প্রায় ২৬০টিতে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
লুটপাট কিংবা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির আবেদন জানাতে কৌঁসুলিদের নির্দেশ দিয়েছেন দারমানাঁ। এসব শাস্তির মধ্যে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বাধা দেওয়ার মতো পদক্ষেপও রয়েছে।
ব্যয় সংকট ও রাজনৈতিক মেরুকরণে বাড়ছে অসন্তোষ
ফ্রান্সের জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতে ভবিষ্যৎ সরকারকে বড় ধরনের সরকারি ব্যয় কমাতে হতে পারে—এমন সতর্কবার্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এর পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হচ্ছে। এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বিভাজনমূলক ও অনিশ্চিত নির্বাচনী সময়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স।
আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়বেন মাখোঁ। জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাঁর মধ্যপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের কোনো প্রার্থী আগামী মে মাসের নির্বাচনে শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে ফরাসি ভোটারদের সামনে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি এবং কট্টর বামপন্থী লা ফ্রঁস ইনসুমিজ—এই দুই দলের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
দুই দলের শীর্ষ নেতারাই সহিংসতার জন্য মাখোঁ ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে দায়ী করেছেন। মাখোঁর মধ্যপন্থী দল কার্যকর সরকার গঠন এবং আইন পাসের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় পড়ায় জনমনে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, সেটিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চাইছে তারা।
লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভে পুলিশের কঠোর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে মাখোঁ ‘প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করছেন’।
গত সপ্তাহের মতো এবারও সমর্থকদের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মেলঁশোঁ। তবে আগের সপ্তাহের বিক্ষোভের পর ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গার নিন্দাও জানিয়েছেন তিনি।
অরলিয়ঁসে সংঘর্ষের আশঙ্কা
শনিবার প্যারিসের প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অরলিয়ঁ শহরে ন্যাশনাল র্যালির দুই দিনের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কট্টর ডানপন্থী দলটির হাজারো সদস্য সেখানে সমবেত হয়ে নেতা মারিন লে পেনের বক্তব্য শোনার কথা রয়েছে। এর বিপরীতে বামপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের কর্মী-সমর্থকেরাও শহরটিতে জড়ো হতে পারেন।
এ সপ্তাহে অরলিয়ঁসের মেয়র বলেছেন, সেখানে প্রত্যাশিত জনসমাগম ‘নজিরবিহীন’। সম্ভাব্য সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে হাজারো পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে বলেও জানান তিনি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহরটির গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া লে পেনের এবার জয়ের সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হতে পারে। যদিও চলতি বছরের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল আত্মসাতের দায়ে আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। তবে কোনো অপরাধ করার কথা অস্বীকার করে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/