দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় পাঞ্জাব রাজ্যের চণ্ডীগড় শহরের উপকণ্ঠে এ বছরের শুরুতে চালু হয়েছে ৪৭৩ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ অভিজাত স্কুল বেডফোর্ডের প্রথম আন্তর্জাতিক বালিকা ক্যাম্পাস।
ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ারে অবস্থিত স্কুলটির মূল ক্যাম্পাসের উল্লেখযোগ্য গথিক স্থাপত্যের বিপরীতে ভারতের ক্যাম্পাসটি আধুনিক নকশায় তৈরি। সেখানে রয়েছে বিশেষভাবে নির্মিত একাধিক একাডেমিক ভবন। তবে লাল ইটের একটি ঘড়ির টাওয়ারে ফুটে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির ব্রিটিশ ঐতিহ্য।
বেডফোর্ড স্কুল মোহালি এখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্যাম্পাস চালু করা অন্তত ছয়টি ব্রিটিশ অভিজাত স্কুলের সর্বশেষ সংযোজন। এসব স্কুল দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যসম্পন্ন, উচ্চ বেতননির্ভর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তালিকায় রয়েছে ব্রিটেনের সবচেয়ে পুরোনো তিনটি স্কুলও। চীনে ব্যবসার পরিবেশ কঠিন হয়ে ওঠা এবং ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ব্রিটেনে বেসরকারি স্কুলের ফিতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের পর তাদের এই সম্প্রসারণের উদ্যোগ আরও গতি পেয়েছে।
ভারতের প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ ব্যবসার কেন্দ্র বেঙ্গালুরুতে ২০২৩ সাল থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী হ্যারো স্কুল। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ছিলেন এই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী। মধ্য ভারতের ভোপালে ক্যাম্পাস স্থাপন করেছে শ্রুজবেরি স্কুল। আর পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পুনেতে কার্যক্রম শুরু করেছে ওয়েলিংটন কলেজ। খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের কারণে পুনেকে বলা হয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’।
মিলফিল্ড, কুইন এলিজাবেথ স্কুলসহ আরও কয়েকটি ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী কয়েক বছরে ভারতে শাখা ক্যাম্পাস চালু করতে পারে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের পাবলিক স্কুলব্যবস্থার আদলে গড়ে ওঠা অভিজাত আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব স্কুলে মূলত উচ্চবিত্ত ও অভিজাত পরিবারের সন্তানেরা পড়াশোনা করে। তবে সম্প্রতি দেশটিতে নতুন করে ধনী হয়ে ওঠা পরিবারগুলোর মধ্যে সন্তানদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়ায় এই বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বেঙ্গালুরুতে হ্যারো স্কুলের প্রধান ক্যারোলিন প্যাসকো বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম অনেক পরিবারের জন্য বড় আকর্ষণ।’
হ্যারো ও বেডফোর্ড ভারতের হাতে গোনা কয়েকটি স্কুলের মধ্যে রয়েছে, যারা প্রাথমিক স্তর থেকে এ-লেভেল পর্যন্ত ক্যামব্রিজ পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। বিশ্বজুড়ে ১০ হাজার স্কুলে স্বীকৃত এই শিক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদানের সুযোগ তৈরি করেছে।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুলের একটি শাখা পরিচালনা করে এমন একটি পরিবারের সদস্য হরসিমরন সিং কোচর তাঁর পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে পরনীতকে বেডফোর্ড মোহালিতে ভর্তি করিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, স্কুলটির চরিত্র গঠন, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ও সামগ্রিক বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। শুধু পড়াশোনার ফলের ওপর জোর না দেওয়াও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এ ছাড়া ভারতের অনেক স্কুলের মতো এখানে ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’ নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সিং বলেন, ‘সব শিশুর সঙ্গে সমান আচরণ করা হয়। মন্ত্রী ও আমলাদের সন্তানেরা বাড়তি কোনো সুবিধা পায় না।’
ভারতের সচ্ছল পরিবারগুলোর পাশাপাশি বিদেশে দীর্ঘদিন থাকার পর দেশে ফিরে আসা অনাবাসী ভারতীয় এবং যুক্তরাজ্য বা মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত যেসব অভিভাবক সন্তানদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতে চান, তাঁরাও এসব স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক বলে জানান প্যাসকো।
বেঙ্গালুরুতে হ্যারো স্কুলের ৬০ শতাংশ কর্মী আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব ঐতিহ্যও ভারতীয় ক্যাম্পাসে নিয়ে এসেছে। এখানে শিক্ষকদের ‘বিকস’ নামে ডাকা হয়। শিক্ষার্থীরা হ্যারোর ঐতিহ্যবাহী টুপি ও ইউনিফর্ম পরে এবং বিশ্বের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আয়োজিত ‘দ্য লং ডাক্কার’ নামের ক্রস-কান্ট্রি দৌড়ে অংশ নেয়। ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য হিসেবে এখানে রয়েছে হাউসভিত্তিক ব্যবস্থাও।
তবে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতি। প্রতিদিন সকালে ভারতের জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় এবং হিন্দুদের অন্যতম বড় উৎসব গণেশ চতুর্থী উদ্যাপন করা হয়।
ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং নতুন করে কোটিপতি হয়ে ওঠা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি ব্রিটিশ স্কুলগুলোর সম্প্রসারণে সহায়ক হচ্ছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির পেছনে চীনের বাজারে গতি কমে আসারও বড় ভূমিকা রয়েছে।
গত এক দশকে বিদেশে ব্রিটিশ স্কুলগুলোর সম্প্রসারণের বড় অংশই হয়েছে চীন ও হংকংয়ে। যুক্তরাজ্যের ৫০টি স্কুল পরিচালিত ১৫১টি শাখা ক্যাম্পাসের প্রায় অর্ধেকই এই দুই অঞ্চলে অবস্থিত।
তবে নীতিমালার পরিবর্তন, সরকারের বাড়তি নজরদারি এবং কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় সরকারগুলোর বিরোধিতার কারণে সেখানে সম্প্রসারণের গতি কমেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রাইভেট এডুকেশন পলিসি ফোরামের (পিইপিএফ) ২০২৫ সালের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৪ সালে চীনে কার্যকর হওয়া একটি নতুন আইনে সব বিষয়ের পাঠদানে দেশপ্রেমমূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। এতে ব্রিটিশ স্কুলগুলোর সম্প্রসারণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি পরিকল্পিত কিছু ক্যাম্পাস বাতিলও করতে হয়। ফলে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো বিকল্প বাজারের দিকে নজর দিচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের শরৎকালীন বাজেটে ব্রিটেনের সরকার বেসরকারি স্কুলের ফির ওপর ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে। বেডফোর্ড স্কুল মোহালির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নাওমি অ্যাটকিনসের মতে, এই সিদ্ধান্ত অনেক স্কুলকে বিদেশে সম্প্রসারণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘তারা এখন মরিয়া পরিস্থিতিতে রয়েছে। যেসব স্কুল আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের কথা ভাবেনি, তারাও হঠাৎ ভারতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।’
তবে ভারতের বাজারে ব্যবসা করা সহজ নয় বলেও স্বীকার করেন অ্যাটকিনস। অধিকাংশ ব্রিটিশ স্কুল স্থানীয় বিনিয়োগকারী বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ভারতে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
অ্যাটকিনসের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে অন্য দেশে স্থানীয় অংশীদারকে রাজস্বের ১০ শতাংশ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার চুক্তি করা সম্ভব হতো। কিন্তু ভারতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই মুনাফার হার কমে মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে।
বাজারের আকার নিয়েও অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার প্রবণতা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ভারতে প্রায় ২৫ কোটি শিশু স্কুলে পড়াশোনা করলেও দেশটিতে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। ফলে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনামের মতো ইংরেজি মাতৃভাষা নয়—এমন দেশগুলোর তুলনায় এখানে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি।
এ ছাড়া ভারতের মাথাপিছু আয় তুলনামূলকভাবে কম। ব্রিটিশ স্কুলগুলোর উচ্চ ফিও তাদের বাজার সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করছে। এসব স্কুলে পূর্ণকালীন আবাসিক শিক্ষার জন্য বছরে ১৫ হাজার পাউন্ড বা তারও বেশি ফি নেওয়া হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও চীনে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে অ্যাটকিনস বলেন, ‘ভারতীয়রা দামের বিষয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। তারা সাশ্রয়ী দামে ভালো কিছু পেতে পছন্দ করেন।’
এ কারণেই বেডফোর্ড মোহালিতে অন্যান্য ব্রিটিশ স্কুলের তুলনায় প্রায় অর্ধেক ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
পিইপিএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে ব্রিটিশ স্কুলগুলোর বিদেশি শাখা ক্যাম্পাসগুলো থেকে মোট ১৫২ দশমিক ৪ মিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা এসেছে। সময়ের সঙ্গে এই মুনাফার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে ভারতে এই সম্প্রসারণ দ্রুত বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে ধীর ও স্থিতিশীল গতিতে এগোবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির ঔপনিবেশিক অতীত এবং নতুন ধনী শ্রেণির উত্থান ব্রিটিশ ঐতিহ্যবাহী স্কুলগুলোর জন্য বড় ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে চীনের বাজার হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো বড় বাজার ভারতে তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/