দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ঘাঘড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ মোগল আমলের নির্মিত একটি প্রাচীন স্থাপনা। স্থানীয়দের মতে, প্রায় ৪১৮ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
ঝিনাইগাতী উপজেলার হাতিবান্ধা ইউনিয়নের ঘাঘড়া লস্কর এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদটি বাংলা ১২২৮ সনে, ইংরেজি ১৬০৮ সালে নির্মিত হয়েছে বলে জানা যায়। কথিত আছে, ‘পালানো খা’ ও ‘জব্বার খা’ নামে দুই সহোদর ভাই কোনো এক রাজ্যের সেনাপতি ছিলেন। কয়েকশ বছর আগে যুদ্ধে পরাজয়ের পর তারা এ এলাকায় আশ্রয় নেন এবং মসজিদটি নির্মাণ করেন।
মসজিদটির বিশেষত্ব হলো এর নির্মাণশৈলী। চারকোণা টালির মতো বিশেষ ধরনের ইট দিয়ে এটি নির্মিত হয়েছে। দেয়ালের গাঁথুনিতে ঝিনুক চূর্ণ বা ঝিনুকের লালার সঙ্গে সুরকি ও তন্তুজাতীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। এক গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকার এই মসজিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ৩০ ফুট এবং দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় চার ফুট। মসজিদের ভেতরে দুটি শক্ত খিলান রয়েছে।
মসজিদের ওপর একটি বড় গম্বুজকে ঘিরে ছোট-বড় মোট ১২টি মিনার রয়েছে। ভেতরের মেহরাব ও দেয়ালে ফুল ও ফুলদানির কারুকাজ দেখা যায়। মসজিদের দরজায় কষ্টিপাথরে খোদাই করা আরবি ভাষায় নির্মাণকাল লেখা ছিল। তবে ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে সেই কষ্টিপাথরটি চুরি হয়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, মোগল আমলের ওই খোদাই করা পাথরটির মূল্য কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
মসজিদ কমিটির তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম জানান, চুরির ঘটনার পর ২০২৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর সকালে ময়মনসিংহের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঝিনাইগাতী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। তবে দীর্ঘদিনেও চুরি হওয়া পাথরটি উদ্ধার হয়নি।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. ফেরদৌস খান বলেন, ‘প্রায় সাড়ে চারশ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদটি আমাদের বংশপরম্পরায় পরিচালিত হচ্ছে। এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়। ইমাম ও মুয়াজ্জিন রয়েছেন। দূর–দূরান্ত থেকে মানুষ মোগল আমলের এই মসজিদ দেখতে আসেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মসজিদের নামে দুটি পুকুর রয়েছে। সেগুলোর আয় থেকে বিভিন্ন খরচ পরিচালিত হয়। আগে মসজিদের ভেতরের কারুকাজে নানা রং ছিল। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সাদা রং করে দেওয়ায় আগের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।’
ভয়েজ অব ঝিনাইগাতীর আহ্বায়ক জাহিদুল হক মনির বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটক ও মুসল্লিরা এই ৪১৮ বছরের পুরোনো মসজিদটি দেখতে আসেন। কিন্তু এখানে কোনো তথ্য সংগ্রহশালা নেই। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে মসজিদের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে পৃষ্ঠপোষকতা চাই।’
ইসলামিক ফাউন্ডেশন শেরপুরের উপপরিচালক এস এম মোহাই মোনুল ইসলাম বলেন, ‘খানবাড়ি জামে মসজিদ শেরপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ইসলামিক নিদর্শন। এখানে পর্যটক ও গবেষকরা আসেন। তবে তথ্য সংগ্রহের জন্য কোনো সংগ্রহশালা নেই। এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মসজিদটির সংস্কার ও উন্নয়নের বিষয়ে পর্যটন কর্পোরেশন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।’
বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে মসজিদটির কিছু সংস্কার কাজ চললেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি তার জৌলুস হারাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।