দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]
কেমন আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর বেদুইন সাত্তার? এক কথায় বলতে গেলে, না ভালো নেই বেদুইন সাত্তার। রোগে-শোকে এখন আর একা একা হেঁটে চলাফেরা করতে পারেন না, হুইলচেয়ার বা কারও সাহায্যে চলাফেরা করতে হয় তাকে।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের সাত্তার মোল্যা। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ভক্ত হয়ে যান বঙ্গবন্ধুর। ১৯৬০ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে নড়াইল সদর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন। তখন থেকেই যেখানেই বঙ্গবন্ধুর সভা সেখানেই ছুটে চলা নড়াইলের সাত্তারের, সেটি হোক টেকনাফ কিংবা তেঁতুলিয়া, কোনো কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারত না।
সময়টা ১৯৭৩ সাল, খুলনার সার্কিট হাউজ মাঠে স্বাধীন বাংলার নেতা বঙ্গবন্ধুর জনসভা। জনাকীর্ণ সভা শুরু হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে জানতে চান- নড়াইলের সাত্তার আসেনি? উপস্থিত সবাই দেখিয়ে দেন কালিয়া থানা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা সর্দার আব্দুস সাত্তারকে। তখন বঙ্গবন্ধু বলেন, এ সাত্তার নয় আমার বেদুইন সাত্তার কই!
উপস্থিত নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর এই কথায় বিস্মিত হন। এ সময় তার সামনে এগিয়ে আসেন কালিয়া উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের ৬ ফুট উচ্চতার সুঠাম দেহি সাত্তার মোল্যা। তখন বঙ্গবন্ধু বলেন- তুইতো সব জায়গায় ঘুরে বেড়াস, আজ থেকে তোর নাম বেদুইন সাত্তার। সেই থেকে সাত্তার মোল্যা হয়ে যান ‘বেদুইন সাত্তার’।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে এই কথা তিনি জানতে পারেন ১৬ আগস্ট সকালে। সিঁড়িতে খালি পায়ে বঙ্গবন্ধুর লাশ পড়ে থাকার কাহিনি শুনে প্রতিজ্ঞা করেন জীবনে আর স্যান্ডেল পায়ে দেবেন না। যেমন প্রতিজ্ঞা তেমনই কাজ এরপর থেকে খালি পায়ে বেড়াতেন বেদুইন সাত্তার। রোদ, বৃষ্টি কিংবা শীত সবই যেন সাত্তারকে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করাতে ব্যর্থ হয়। ব্যবহার করতেন না জুতা, ছাতা ও চাদর। ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর ৫ খুনির ফাঁসি কার্যকরের খবর শুনে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর পুরোনো ছাতা, আলমারিতে রাখা চাদর আর ছেলেদের দেওয়া নতুন স্যান্ডেল ব্যবহার করা শুরু করেন এই বঙ্গবন্ধু ভক্ত।
ছোটবেলা থেকেই প্রতিবাদী সাত্তার অন্যায় দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বেদুইন সাত্তারকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয় পাক হানাদার বাহিনী। ঘরে ঢুকে রাজাকাররা গুলি করে হত্যা করে তার আপন ছোটভাই গোলাম সরোয়ারকে। এ সময় বড়ভাই জাফর আহম্মেদ গুলিবিদ্ধ হন। পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করতেন। পরে ভাইয়ের হত্যাকারী রাজাকার সদস্য মীরাপাড়া গ্রামের আজিজ ওরফে আদাড়েকে হত্যা করেন।
বিভিন্ন সংগ্রাম আর প্রতিবাদের মধ্যে কাটানো ৯৭ বছর বয়সী বঙ্গবন্ধুর বেদুইন সাত্তার বার্ধক্যজনিত কারণে নানা রোগে ভুগে অনেকটা স্মৃতিশক্তিহীন। ঘুমের ঘোরে আজও চারিদিকে বঙ্গবন্ধুকেই খুঁজে ফেরেন এই মুক্তিযোদ্ধা। একা চলতে পারেন না, কখনও ছেলে কখনও ছেলের বৌয়ের হাত ধরে ঘরের বাইরে আসেন। খালি পায়ে চলা বঙ্গবন্ধুর বেদুইন সাত্তারের ভরসা এখন হুইলচেয়ার।
এইউ