দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাংলাদেশ থেকে ভারত ভ্রমণের জন্য যশোরের বেনাপোল দিয়ে সবচেয়ে বেশি যাত্রী যাতায়াত করে থাকে মানুষ। পরে সেখান থেকে ভারতের পেট্টোপোল সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিমবাংলার রাজধানী কলকাতায় গিয়ে চিকিৎসা বা ভ্রমণের জন্য বিভিন্ন প্রদেশে চলে যান। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং সেভেন সিস্টারখ্যাত ৭টি রাজ্যে ভ্রমণের জন্য বেনাপোল ছাড়াও দেশের অন্যান্য জেলায় রয়েছে আরও বেশ কিছু ইমিগ্রেশন পয়েন্ট।
যেখান দিয়ে খুব সহজে ভারতের বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্যে যাতাযাত করা যায়। এর মধ্যে ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা দেশের সর্ব উত্তরের জেলা শেরপুর নাঁকুগাও ইমিগ্রেশন দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং, সিকিম, আসাম, মেঘালয়সহ নেপাল এবং ভুটান যাতায়াতের খুব সহজ রাস্তা রয়েছে। যা কিনা দেশের অনেকেরই অজানা।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ থেকে আসাম ও মেঘালয়ের শিলং যাওয়ার সহজ উপায় হলো সিলেট-তামাবিল-ডাউকি বর্ডার হয়ে। সিলেটের তামাবিল বর্ডার পার হলেই ডাউকি বর্ডার। ডাউকি থেকে ট্যাক্সি পাওয়া যায় শিলংয়ের।
তবে আমাদের ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ সদর, শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর এবং টাঙ্গাইল জেলাসহ দেশের মধ্য অঞ্চল রাজশাহী ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি নাঁকুগাও-ভারতের মেঘালয়ের ডালু ইমিগ্রেশন হয়ে সহজ রাস্তা রয়েছে। শেরপুর হয়ে তুরা এবং ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটি হয়ে লম্বা ভ্রমণ আপনাকে বাড়তি আনন্দ দেবে। তুরার বিশাল বিশাল উঁচু ও আঁকাবাঁকা পাহাড় আর গভীর জঙ্গলের শিহরিত পথ। এ পথে শিলং ভ্রমণে ইচ্ছে করলে একদিনের যাত্রা বিরতি দিয়ে আসাম রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটিও দেখে যেতে পারেন। এখানে শিলংয়ের চাইতে হোটেল ভাড়া অনেক কম। ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫শত টাকার মধ্যে হোটেল পেয়ে যাবেন। তবে এখানে বাংলাদেশের মতোই বেশির ভাগ সময় প্রচণ্ড গরম আবহাওয়া। কেবল মাত্র শীতকালে কিছু ঠান্ডা থাকে।
বর্তমানে নাঁকুগাও-ডালু বর্ডার থেকে সরারসি শিলংয়ের কোনো বাস সার্ভিস চালু হয়নি। তাই ডালু থেকে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় ভাড়ায় বাস ও উইঞ্জারে (মাইক্রোবাস জাতীয়) করে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে তুরা পৌঁছে সেখান থেকে ভোরে উইঞ্জার এবং নাইট বাসে শিলং যেতে পারেন। এছাড়া ডালু বর্ডার পার হয়ে বারাঙ্গাপাড়া বাজার থেকে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি এবং আসামের গুয়াহাটি যাওয়ার জন্য প্রতিদিন বিকেল ৪ থেকে ৫ টার মধ্যে দুটি বাস চালু রয়েছে। ইচ্ছে করলে ওই বাসে শিলিগুড়ি ও গুয়াহাটি যেতে পারেন। শিলিগুড়ি পৌঁছে সেখান থেকে দার্জিলিং, সিকিম, ভুটান ও নেপাল যেতে পারবেন। এছাড়া গুয়াহাটি গিয়ে সেখান থেকে শিলংয়ে মাত্র ২ ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারবেন ভাড়া করা ট্যাক্সি, পাবলিক বাস সার্ভিস অথবা উইঞ্জার জাতীয় বিভিন্ন পরিবহনে। ভাড়া ট্যাক্সি ৪ সিটের জন্য ১ হাজার ৫শত টাকা। আর বাস ভাড়া মাত্র ১২০ টাকা জন প্রতি। সরাসরি পুলিশ বাজার গিয়ে বুক করতে পারেন যেকোনো হোটেল। তবে আগে থেকে অললাইনে হোটেল বুকিং থাকলে ঘুরে ঘুরে হোটেল খোঁজার ঝামেলাটা আর থাকে না। এছাড়া শিলং এবং আসামের গৌয়াহাটিতে সম্প্রতি তুরা থেকে চালু হয়েছে হেলিকাপ্টার সার্ভিস। এ সার্ভিস সপ্তাহের ৫ দিন নিয়মিত যাতায়াত করছে। শিলংয়ে ভাড়া জন প্রতি ১ হাজার ৯ শত রুপি এবং গৌয়াহাটি ভাড়া ১ হাজার ৭ শত রুপি মাত্র। এ হেলিকাপ্টার সার্ভিস ব্যবহার করলে আপনি শেরপুর সীমান্ত থেকে ইমিগ্রেশন কাজ শেষ করে ৩ ঘণ্টার মধ্যে তুরা শহরে গিয়ে মোট ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মধ্যেই মেঘালয়ের শিলং এবং আসামের গুয়াহাটি পৌঁছাতে পারবেন। তবে আপাতত শেরপুর ইমিগ্রেশনে নানা জটিলনায় কারণে একটু সময় বেশি লেগে যায় ইমিগ্রেশন কাজ শেষ করতে। চলতি বছরের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হলেই আরও কম সময়ের মধ্যে ইমিগ্রেশন শেষ করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যাতায়াতের সুবিধা বাড়বে বলে স্থানীয় প্রশাসন এবং ভ্রমণপিপাসুরা জানায়।
নেপাল ও ভুটান এবং ভারতের সিকিম, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি ও দার্জিলিং যেভাবে যাবেন:
ঢাকা বা দেশের যেকোনো স্থান থেকে শেরপুর শহর অথবা জেলার নকলা উপজেলা হয়ে নালিতাবাড়ী উপজেলা সদরে পৌঁছাতে হবে সকাল সকাল। সেখান থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে নাকুগাঁও স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট। সেখানে পৌঁছেই ইমিগ্রেশন কাজ শেষ করে কাস্টমস ও বিজিবির তল্লাশি শেষ করে জিরো পয়েন্ট পার হয়ে বিএসএফের চেকপোস্টে ও ভারতীয় কাস্টমস শেষ করে যেতে হবে আরও দেড় কিলোমিটার দূরে ভারতীয় ইমিগ্রেশন অফিসে। পরে সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে বারাঙ্গাপাড়া বাজার এবং বাজার থেকে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ছোট মাইক্রোবাস এবং মাঝারি সাইজের বাস চলাচল করে তুরা শহরে। এছাড়া পেট্রোলচালিত অটোরিকশা (সিএনজি) রিজার্ভ করেও তুরা শহরে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে ভাড়া অনেক বেশি। রিজার্ভ প্রায় দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। আর বাস ও মাইক্রোবাসের ভাড়া নেবে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা জনপ্রতি।
সম্প্রতি বারাঙ্গাপাড়া থেকে তুরা শহর পর্যন্ত নতুন এবং বেশ প্রসস্ত রাস্তা নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের দিকে। তাই মাত্র ৫০ কিলো দূরত্বের এক ঘণ্টার রাস্তা যেতে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। এরপর তুরা শহরে গিয়ে হাতে গোনা মাত্র তিন-চারটি ভালো মানের হোটেলের একটি বুকিং করে হোটেলের আশেপাশেই শিলং, গোয়াহাটি, শিলিগুড়িসহ বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য আর্শিবাদ, মারাক ট্রাভেল ও রাজধানী ট্রাভেলসহ বেশ কিছু বাস কাউন্টার রয়েছে।
সেসব বাস কাউন্টারে গিয়ে যেখানে যেতে মন চায় আগেভাগেই বুকিং দিয়ে আসুন। শিলংয়ের জনপ্রতি ভাড়া বাসে ৬০০ টাকা ও মাইক্রোবাসে ৮০০ টাকা। তুরা থেকে কেবল ভোরে এবং রাতে বাস বা মাইক্রোবাস চলাচল করে। শিলিগুড়ি গিয়ে আপনার পছন্দমত নেপাল বা ভুটান এবং সিকিমও যেতে পারেন খুব সহজেই।
আবার বারাঙ্গাপড়া থেকে ইচ্ছে করলে টেক্সি রিজার্ভ করে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরত্বের ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে বঙাইগাঁও রেলস্টেশনে যেতে পারেন। ৪ সিটের টেক্সি ভাড়া পড়বে ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা। সেখান থেকে ট্রেনে শিলিগুড়ি পৌঁছাতে লাগবে আরও প্রায় ৫ ঘণ্টা। তবে ট্রেন ভ্রমণের রিলাক্স চিন্তা করে তুরা না গিয়ে বারাঙ্গাপাড়া থেকে যেতে পারেন টেক্সিতেই। অথবা আরও একটু বিশ্রাম নিয়ে পাহাড়ি শহর তুরা দর্শন শেষে তুরা থেকেও বাস বা মিনিবাসে যেতে পারেন আপনার নির্ধারিত ভ্রমণে। শিলিগুড়ি গিয়ে সেখান থেকে ভারতের সিকিম, ভুটান এবং নেপাল যাওয়া যাবে খুব সহজেই।
জেনে রাখা প্রয়োজন
শেরপুরের এ ইমিগ্রেশন পয়েন্ট দিয়ে এখনও পর্যটকদের উল্লেখ্যোগ্য যাতায়াত শুরু হয়নি। যে কারণে এখানে বর্তমানে কোনো ব্যাংক বা মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠা হয়নি। এছাড়া এখানে নেই কোনো ভালো মানের খাবার হোটেল। ফলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আসার আগে ডলার বা রুপি নিয়ে আসতে হবে। এতোদিন ভ্রমণ কর পরিশোধ করা নিয়ে সমস্যা থাকলেও সম্প্রতি কাস্টমস অফিসের ভেতর ভ্রমণকর পরিশোধের জন্য সোনালী ব্যাংকের একটি বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া তুরা শহরে তেমন কোনো মানি চেঞ্জার নেই, ফলে ভারতীয় রুপি নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন। সেজন্য পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে। মানিচেঞ্জার না থাকার কারণে ভারতীয় বিএসএফ ও কাস্টমস সর্বচ্চো ১০ হাজার রুপি সঙ্গে নেয়ার অনুমতি দেয়। সবচেয়ে সতর্ক থাকার বিষয়টা হলো পুরো মেঘালয় রাজ্যের সব শহর এবং দর্শনীয় স্থানে পাহাড়ি, গারো ও খাসিয়াদের আধিপত্য। তারা বাংলাদেশি বা পর্যটকদের খুব বেশি ভালো চোখে দেখে না। তবে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে পারলে তারা খুবই আন্তরিক। এছাড়া পাহাড় ও বনঘেরা শহরগুলোতে সন্ধ্যার পর সব ব্যবসা-বাণিজ্য ও লোকসমাগম বন্ধ হয়ে যায়। তাই সন্ধ্যার পর হোটেলের বাইরে না থাকাই উত্তম। তুরা এলাকায় সম্প্রতি বেশ কযেকটি বেড়ানোর স্পট তৈরি করেছেন রাজ্য সরকার। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, দাড়িচিক গ্রি নকরেক পার্ক, ন্যাশনাল পার্ক, দারিবেক গ্রি সানসেট ভিউ পয়েন্ট, ওয়াটার ফলস ইত্যাদি। এছাড়া তুরা শহরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বেশ চমৎকার কিছু ন্যাচারাল ভিউ।
জেবি