দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির দায়িত্বের শেষ দিনে দীর্ঘ বিদায়ী বার্তা দিয়েছেন। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, সাংগঠনিক কার্যক্রম, সাফল্য-ব্যর্থতা ও সহযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
নাছির বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের দুঃসময়ে আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। সেই কঠিন সময় থেকে শুরু করে দীর্ঘ সতেরো বছরের সীমাহীন অনিশ্চয়তা শেষে উজ্জ্বল ভিন্ন এক বাংলাদেশে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এই পথচলা সহজ ছিলো না; ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন, গুম ও খুনের ভয়াবহ বাস্তবতা। এই দীর্ঘ সময়ে যারা গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেই সকল নেতাকর্মীকে আমি গভীর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাদের ত্যাগই আমাদের আজকের শক্ত অবস্থানের ভিত গড়ে দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। একটি দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। বিদায়ের এই মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে অসংখ্য স্মৃতি- সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা এবং সবচেয়ে বেশি করে আমার সহযোদ্ধাদের ভালোবাসা।’
ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে এসে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। তখন হয়ত ভাবিনি, একদিন এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার দুর্লভ সুযোগ আমার জীবনে আসবে। কিন্তু রাজনীতি কখনো শুধু পদ-পদবির বিষয় নয়; এটি মানুষের জন্য কাজ করার, সংকটে পাশে দাঁড়ানোর এবং নিজের বিশ্বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার এক দীর্ঘ যাত্রা। সেই যাত্রায় ছাত্রদল আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপোশহীন নেতৃত্ব আমার রাজনৈতিক জীবনের সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা ছিল। ওনার দৃঢ়তা, ত্যাগ এবং গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল অবস্থান আমাদের প্রতিটি সংগ্রামের শক্তি হয়ে থেকেছে।’
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মীর ভূমিকার কথা তুলে ধরে নাছির বলেন, ‘২০২৪ সালের ১ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমরা একটি কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলেছি। কিন্তু আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। সেই উত্তাল সময়ে নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাদের সাহস জোগানো, সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা-এটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জুলাই-আগস্টের সেই আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থেকেছেন। ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ এবং চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্ব অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের প্রত্যেকের প্রতি আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা। তাদের অনেকের নাম হয়ত ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে না, কিন্তু একটি গণ-আন্দোলনের ইতিহাস কখনো শুধু কয়েকজন মানুষের নাম লিখে শেষ হয়ে যায় না। এর পেছনে থাকে হাজারো পরিচয়হীন, নির্ভীক ও দুঃসাহসিক তরুণের ত্যাগ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই আন্দোলনের সময়ে নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে অসাধারণভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। আন্দোলনের সময়ে তারা ছাত্রদলকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে হয়ত ছাত্রদলের অবদান তারা সবসময় সমানভাবে স্বীকার করতে পারেনি; কিন্তু আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, সংকটের সময়ে যারা একসঙ্গে কাজ করেছে, ইতিহাসের বিচারে সেই সহযোগিতার মূল্য অপরিসীম।’
আন্দোলনের পর নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলের বন্যার সময় প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ও তৎকালীন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ফেনীতে যাওয়ার কথাও স্মরণ করেন নাছির। তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পরপরই নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমি যেহেতু ওই এলাকার সন্তান, সেই সময় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাকে বলেছিলেন, তুমি ওই এলাকার সন্তান হিসেবে দ্রুত বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াও। আমি তারেককে বলবো তোমাকে যেন তাড়াতাড়ি ফেনীতে পাঠায়। সেদিন রাতে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, আম্মা তোমাকে দ্রুত ফেনী গিয়ে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বলেছেন। দেশনেত্রীর আদেশ ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (তৎকালীন) স্যারের নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই সেদিন রাতেই ফেনীর উদ্দেশে রওনা হয়ে যাই। দুই দিন পর আমাদের রাকিব ভাইসহ সুপার ফাইভের বাকি নেতৃবৃন্দও ফেনীসহ বৃহত্তর নোয়াখালীতে ছুটে আসেন। আমরা তখন বুঝেছি, রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিংয়ের বিষয় নয়; মানুষের দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সেই নির্দেশ আমার কাছে শুধু একজন নেত্রীর নির্দেশ ছিল না; এটি ছিল আপন সন্তানের প্রতি অসহায় বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান। শারীরিকভাবে তিনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন না, কিন্তু তার সেই নির্দেশ, তার মমতা এবং মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা আমাদের পথ দেখিয়েছে। দেশনেত্রীর প্রতি আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।’
দায়িত্ব পালনের সময়ে ‘মব সংস্কৃতি’, নানা প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ছাত্রদলকে সক্রিয় রাখা কঠিন ছিল বলে উল্লেখ করেন নাছির। তিনি বলেন, ‘এই দীর্ঘ দায়িত্বকালে আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের আরেকটি কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেটা হলো মব সংস্কৃতি। চারদিকে নানা ধরনের প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় রাখা সহজ ছিলো না। সব প্রোপাগান্ডা কাটিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা ছিল প্রতিনিয়ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আমাদের দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছে। এটি কোনো একজনের কৃতিত্ব নয়; এটি ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল।’
তবে কয়েকটি কমিটি গঠন করতে না পারার আক্ষেপও প্রকাশ করেন নাছির। তিনি বলেন, ‘তবে আমাদের কিছু অপূর্ণতাও আছে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অল্প কয়েকটি কমিটি আমরা সম্পন্ন করতে পারিনি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপ আমার থাকবে। এই অপূর্ণতার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। যারা কমিটি গঠনের মাধ্যমে দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের অনেকেই অবশ্যই যোগ্য ছিলেন এবং তাদের যোগ্যতার স্বীকৃতিই তারা পেয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এমন অনেক সহযোদ্ধাও আছেন, যারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি— তাদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা ও শ্রদ্ধা। একটি পদ কারও যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। যারা এক কমিটিতে দায়িত্ব পাননি, তাদের অনেকেই আগামী দিনের নেতৃত্বে আরও বড় ভূমিকা রাখবেন, এই বিশ্বাস আমার আছে। তাদের জন্য রইল উজ্জ্বল আগামীর শুভকামনা।’
ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়াকেও নিজের দায়িত্বকালের একটি আক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন ছাত্রদলের এই নেতা। তিনি বলেন, ‘একজন সংগঠক হিসেবে এই ফলাফল আমাকে প্রায়ই ভাবিয়েছে। কোথায় আমাদের ঘাটতি ছিল, কোথায় আরও ভালো করা যেত—এসব প্রশ্ন নিজের কাছে করেছি। রাজনীতিতে পরাজয়ও শিক্ষা দেয়। আমি বিশ্বাস করি, ছাত্রদল এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, আরও গ্রহণযোগ্য এবং আরও সংগঠিত ছাত্রসংগঠন হয়ে উঠবে।’
বিদায়ী বার্তায় বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল বকুলসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নাছির। একই সঙ্গে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয়, জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
নাছির বলেন, ‘আজ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ছাত্রদল থেকে নয়। পদ থেকে বিদায় নেওয়া যায়; আদর্শ থেকে নয়, ভালোবাসা থেকে নয়, সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে নয়। আগামী দিনে ছাত্রদলে যারাই নেতৃত্বে আসবেন, আমি বিশ্বাস করি, তাদের নেতৃত্বে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, আরও সংগঠিত এবং আরও গতিশীল হবে। নতুন নেতৃত্বের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা থাকবে। তাদের প্রয়োজন হলে, তাদের ডাকে আমি আগের মতোই পাশে থাকব, ইনশাআল্লাহ।’
ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবনে ছাত্রদল যে পরিচয় আমাকে দিয়েছে, তা কোনো পদ দিয়ে মাপা যায় না। এই সংগঠনের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে আমি যে মানুষগুলোকে পেয়েছি, যে বন্ধুত্ব পেয়েছি, যে ভালোবাসা পেয়েছি -সেগুলোই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। আমার সহযোদ্ধাদের কাছে যদি কোনোদিন কোনো আচরণে কষ্ট দিয়ে থাকি, কোনো সিদ্ধান্তে অন্যায় হয়ে থাকে, কারও প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়ে থাকি তাহলে আমাকে ক্ষমা করবেন।’
তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার, যারা আমার রাজনৈতিক জীবনের অনিশ্চয়তা, ব্যস্ততা, অনুপস্থিতি এবং অসংখ্য কঠিন সময় নীরবে সহ্য করেছে, তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা আমার বন্ধুদের প্রতি। কৃতজ্ঞতা সাংবাদিক ভাই-বোনদের প্রতি, যারা আমাদের কার্যক্রম মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন, কখনো প্রশংসা করেছেন, কখনো সমালোচনা করেছেন। তাদের সমালোচনাও আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় ছিলো।’
নাছির বলেন, ‘আজ বিদায় নিচ্ছি একটি দায়িত্ব থেকে। কিন্তু সম্পর্ক থেকে নয়, সংগ্রাম থেকে নয়, আদর্শ থেকে নয়। দেখা হবে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে, অন্য কোনো দায়িত্বে, অন্য কোনো সময়ে। ততদিন পর্যন্ত ছাত্রদল তার নিজের শক্তিতে, তার নেতাকর্মীদের ভালোবাসায় এবং তার আদর্শের ভিত্তিতে আরও এগিয়ে যাক। পরবর্তী নেতৃত্বের হাত ধরে প্রাণের সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আরও শক্তিশালী হোক। ছাত্রদলের প্রতিটি সহযোদ্ধার আগামী সুন্দর হোক। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হোক। জীবনের কোনো এক প্রান্তে গিয়ে সুখময় সমৃদ্ধ ও সফল বাংলাদেশ দেখতে পাবো, সে স্বপ্ন দেখি নিরন্তর। আমার পরিচয়-প্রতীম ছাত্রদল সেই সে বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে থাকুক অবিচল এ সুন্দরতর প্রত্যাশায় শেষ করছি।’
/অ