দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। একসময় যাকে স্বামী জিয়াউর রহমানের ‘লাজুক গৃহিণী’ হিসেবে বর্ণনা করা হতো, সেই খালেদা জিয়াই পরে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেত্রীদের একজন হয়ে ওঠেন।
খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালে, তখনকার ব্রিটিশ ভারতের দিনাজপুরে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যোগ দেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি রাজনৈতিক দল ও মুক্ত গণমাধ্যম পুনরায় চালু করেন। তবে তার শাসনামল একাধিক সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা ও সেনাসদস্যদের গণহত্যার ঘটনাতেও চিহ্নিত হয়ে আছে।
১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তখন মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হন খালেদা জিয়া। এর আগে পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না এবং জনজীবনে খুব কমই দেখা যেত।
১৯৮২ সালে তিনি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন এবং পরে দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন। একই বছরে সেনাপ্রধানের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে শুরু হয় নয় বছরের সামরিক শাসন। এই সময়ে খালেদা জিয়া সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলনে নামেন এবং সেনা-নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন বর্জনের নেতৃত্ব দেন। একাধিকবার গৃহবন্দি হলেও তিনি মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।

১৯৯০ সালে সামরিক সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বড় অংশ সংসদের হাতে আসায় তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান হন এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তার নেতৃত্বে দেশে পুনরায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়।
প্রথম মেয়াদে তার উল্লেখযোগ্য সংস্কারের মধ্যে ছিল প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে করা। তবে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের কাছে পরাজিত হন।
২০০১ সালে ইসলামপন্থী কয়েকটি দলের সঙ্গে জোট গড়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি আবারও ক্ষমতায় ফেরেন। ওই নির্বাচনে জোটটি সংসদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পায়। তবে ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে সমালোচনা হয়। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি নারী এমপিদের জন্য কোটা চালু এবং তরুণীদের শিক্ষায় গুরুত্ব দেন, এমন এক দেশে যেখানে তখন প্রায় ৭০ শতাংশ নারী নিরক্ষর ছিল।
২০০৬ সালে মেয়াদ শেষে রাজনৈতিক শূন্যতা ও সহিংসতায় দেশ অস্থির হয়ে ওঠে। সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করে। এর আওতায় খালেদা জিয়া ও তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা দুজনই গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘদিন সরকার ও বিরোধী দলে পালাক্রমে থাকা এই দুই নেত্রী হঠাৎ করেই মামলার জালে আটকে পড়েন।

পরবর্তীতে বিধিনিষেধ শিথিল হলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা হন। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের ফলে সংসদে বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকেনি।
২০১৮ সালে একটি এতিমখানা ট্রাস্টের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ডলার আত্মসাতের অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের একমাত্র বন্দি ছিলেন। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় তার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে ২০১৯ সালে তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং পরে মানবিক বিবেচনায় গৃহবন্দি করা হয়।
২০২৪ সালে গণঅসন্তোষের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও বদলে যায়। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান এবং নতুন অন্তর্বর্তী সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয় ও তার ব্যাংক হিসাব অবমুক্ত করার নির্দেশ দেয়। সে সময় তিনি লিভার সিরোসিস ও কিডনি ক্ষতিসহ প্রাণঘাতী নানা রোগে ভুগছিলেন।
একাধিক মামলায় খালাস পাওয়ার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান জীবিত আছেন। দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসনে থাকার পর তিনি ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশে ফেরেন এবং তাকে বাংলাদেশের পরবর্তী নেতৃত্বের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান ২০১৫ সালে মারা যান।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/