দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার দিন থেকেই দেশের জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদকে ধ্বংসের চক্রান্ত শুরু করেন সদ্য সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সূত্রে। অভিযোগ অনুযায়ী, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নগদে প্রশাসক নিয়োগ, পরে সেই পদক্ষেপকে বৈধতা দিতে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে নতুন আইনের গেজেট প্রকাশসহ একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সূত্রগুলো জানায়, নিজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠনসহ নানা কর্মপন্থা গ্রহণ করা হয় নগদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে। একের পর এক উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও গত দেড় বছর ধরে নতুন করে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। নগদ বিক্রি বা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজার একচেটিয়া করার লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নগদের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। একই সময়ে বিদায়ের প্রাক্কালে বিকাশকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার শপথের আগের দিন জরুরি বৈঠক ডাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের মুখে লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বিকাশের উপদেষ্টা হিসেবে পূর্ববর্তী সংশ্লিষ্টতার ধারাবাহিকতায় একটি প্রতিষ্ঠানের পথ সুগম করার চেষ্টা ছিল তার লক্ষ্য। সেই প্রেক্ষাপটে নগদ ছিল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। গভর্নর হওয়ার আগেও তার প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের আলোচনায় নগদবিরোধী বক্তব্য উপস্থাপনের অভিযোগ রয়েছে।
গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে, ২১ আগস্ট ২০২৪, পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন উল্লেখ করে নগদে সাত সদস্যের প্রশাসক দল নিয়োগ করা হয়। তবে সে সময় আইনটি কার্যকর ছিল না। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আইনটির ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। আইনটির ৩১ ধারায় প্রশাসক নিয়োগের আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি বলে অভিযোগ।
ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, যে আইনের ভিত্তিতে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল, তা সে সময় কার্যকর ছিল না। পরে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দেওয়া হয়, যা আইনসম্মত নয়। তিনি আরও বলেন, প্রশাসক নিয়োগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া এবং গভর্নরের পূর্ববর্তী সংশ্লিষ্টতার কারণে স্বার্থসংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে।
পরিচালনা পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রেও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বোর্ডের প্রধান করা হয় বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদকে, যিনি আগে বিকাশের পরামর্শক ছিলেন। বিআইজিডির ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো খন্দকার সাখাওয়াত আলী এবং পিআরআই-এর রিসার্চ ডিরেক্টর ড. বজলুল হক খন্দকারকেও বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব নিয়োগের মাধ্যমে নগদে প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি সূত্রগুলোর।
গত দেড় বছরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও সংবাদ সম্মেলনে নগদ নিয়ে ধারাবাহিক নেতিবাচক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সাবেক গভর্নরের বিরুদ্ধে। কখনও নগদ বিক্রির কথা, কখনও একে অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো গড়ে তোলার বক্তব্য সামনে আসে।
প্রশাসক নিয়োগের পর নগদের ব্যবসা সংকুচিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে যেখানে নিবন্ধিত গ্রাহক ছিল ৯ কোটি ৭৬ লাখ, বর্তমানে তা কমে ৭ কোটি ৬৩ লাখে দাঁড়িয়েছে। দৈনিক লেনদেন আগের মতো হাজার কোটি টাকার ওপরে থাকলেও সার্বিক মোবাইল আর্থিক সেবা খাতে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে নগদের লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। বহু প্রতিষ্ঠান নগদের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণে অনাগ্রহ দেখিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ মনে করছেন, একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের এমন আচরণ দেশের আর্থিক খাতের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। ব্যাংক একীভূতকরণের তালিকা প্রণয়নেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ সংবাদ সম্মেলনে সাবেক গভর্নরের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
সূত্রগুলোর দাবি, গভর্নর ও তার বর্তমান স্ত্রীর আর্থিক অসততার বিষয়টিও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে আলোচনায় রয়েছে। তার সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধেই কর্মকর্তারা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন বলে জানা গেছে।
এমএস/