দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ১ জুলাই থেকে কার মূল বেতন কত হবে। একই গ্রেডে থাকা সবার বেতন যে এক হবে না, সেটিও স্পষ্ট করা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে। ৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া মূল বেতন, বর্তমান গ্রেড এবং নির্ধারিত বেতনক্রমের ভিত্তিতে ‘পে ফিক্সেশন’ করে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর প্রজ্ঞাপনে পুরোনো বেতন থেকে নতুন বেতন নির্ধারণের বিস্তারিত বিধান দেওয়া হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর প্রতিটি গ্রেডের বিপরীতে ২০২৬ সালের সংশ্লিষ্ট বেতনক্রম দেওয়া হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামোয় গ্রেডভেদে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১ থেকে ১১ নম্বর গ্রেডে মূল বেতন ১০০ শতাংশ এবং ১২ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডে ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিদ্যমান ২০টি গ্রেড রেখেই নতুন বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা, যা ২০তম গ্রেডের জন্য। আর গ্রেড ১-এ সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তবে মন্ত্রিপরিষদ, মুখ্য সচিব ও সিনিয়র সচিব বাদে।
শুধু গ্রেড জানলেই হবে না
নতুন বেতন স্কেলে একজন চাকরিজীবীর বেতন কত হবে, তা নির্ধারণে শুধু গ্রেড জানলেই হবে না। প্রজ্ঞাপনে ‘বর্তমান বেতন’ বলতে গত ৩০ জুন পর্যন্ত জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী পাওয়া বেতনকে বোঝানো হয়েছে। ফলে ৩০ জুন তার মূল বেতন কত ছিল, সেটিও জানতে হবে।
একই গ্রেডের দুই কর্মকর্তার নতুন বেতনও এক নাও হতে পারে। একজন যদি ওই গ্রেডে কয়েক বছর ধরে থেকে একাধিক বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি পেয়ে থাকেন এবং অন্যজন সম্প্রতি ওই গ্রেডে যোগ দিয়ে থাকেন, তাহলে ৩০ জুন তাদের মূল বেতন ভিন্ন হবে। ফলে নতুন বেতনও ভিন্ন অঙ্কে নির্ধারিত হতে পারে।
প্রজ্ঞাপনে প্রতিটি গ্রেডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একাধিক বেতনের ধাপ রাখা হয়েছে। তাই কোনো গ্রেডের নতুন প্রারম্ভিক বেতন যে অঙ্কে নির্ধারণ করা হয়েছে, ওই গ্রেডে বর্তমানে কর্মরত প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নতুন মূল বেতন সেই অঙ্ক হবে না।
দুই পদ্ধতিতে হবে বেতন নির্ধারণ
নতুন প্রজ্ঞাপনে মূলত দুটি পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। প্রথম পদ্ধতিতে, কোনো কর্মচারী যদি বর্তমান বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন পান, তাহলে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর অনুরূপ স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপেই তার বেতন নির্ধারণ করা হবে।
উদাহরণ হিসেবে, ৩০ জুন কোনো কর্মচারী যদি ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২২ হাজার ৪৯০ টাকা বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে অর্থাৎ ৯ হাজার ৩০০ টাকা মূল বেতন পেয়ে থাকেন এবং তিনি ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী হন, তাহলে নতুন কাঠামোয় ১৬তম গ্রেডের ২১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ অর্থাৎ ২১ হাজার ৯০০ টাকা তার নতুন মূল বেতন হবে।
অর্থাৎ পুরোনো বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন থাকলে নতুন বেতন স্কেলেরও প্রারম্ভিক ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হবে।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে, কোনো কর্মচারীর মূল বেতন যদি বর্তমান বেতন স্কেলের সংশ্লিষ্ট স্কেলের সর্বনিম্ন ধাপের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে প্রথমে বর্তমান বেতন ও ওই স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের মধ্যকার পার্থক্য বের করতে হবে। এরপর সেই পার্থক্য জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর অনুরূপ স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে যোগ করতে হবে।
যোগফল যদি নতুন স্কেলের কোনো নির্ধারিত ধাপের সমান হয়, তাহলে ওই ধাপেই বেতন নির্ধারণ করা হবে। আর যদি ওই অঙ্কের সমান কোনো ধাপ না থাকে, তাহলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, ৩০ জুন পর্যন্ত একজন কর্মচারীর ইনক্রিমেন্টসহ মূল বেতন ছিল ১৩ হাজার ৭৯০ টাকা। তার বর্তমান বেতন স্কেলের ধাপ হলো ১২,৫০০-১৩, ১৩০-১৩, ৭৯০...৩০, ২৩০ টাকা।
এখন ১ জুলাই থেকে ওই কর্মচারীর জন্য অনুরূপ নতুন বেতন স্কেল হলো ২৫,০০০-২৬,৩০০...৬০,৫০০ টাকা।
এখন হিসাবটি হবে এভাবে— বর্তমান বেতন স্কেলে প্রাপ্ত মূল বেতন থেকে একই স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের বেতন বিয়োগ দিলে পার্থক্য হবে: ১৩,৭৯০-১২,৫০০ = ১,২৯০ টাকা।
অতএব জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে এই ১২৯০ টাকা যোগ করতে হবে। হিসাবটি হবে ২৫,০০০ + ১,২৯০ = ২৬,২৯০ টাকা। কিন্তু নতুন বেতন স্কেলে ২৬ হাজার ২৯০ টাকার কোনো ধাপ নেই। তাই পরবর্তী উচ্চতর ধাপ অর্থাৎ ২৬ হাজার ৩০০ টাকা তার নতুন মূল বেতন হিসেবে নির্ধারিত হবে।
তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মূল নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা, সিনিয়র সচিবের ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা এবং গ্রেড ১-এর ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ও সমমর্যাদার পদের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এ দুটি পদ্ধতি প্রযোজ্য হবে না। তাদের মূল বেতন নির্ধারিত হওয়ায় তা আর বাড়বে না।
ধাপে ধাপে কার্যকর হবে বেতন বৃদ্ধি
নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও বর্ধিত বেতনের পুরোটা একসঙ্গে দেওয়া হবে না। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ প্রাপ্ত বেতনের সঙ্গে যোগ করে পাবেন।
এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে।
গত ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়া বেতনও পাবেন।
প্রেষণ ও ছুটিতে থাকা কর্মীদের বেতন
প্রেষণে থাকা কোনো কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ করা হবে, তিনি প্রেষণে কর্মরত না থাকলে মূল দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে যে বেতন পাওয়ার অধিকারী হতেন, সেই ভিত্তিতে।
ছুটি, সাময়িক বরখাস্ত ও অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের নিয়মও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কোনো কর্মচারীর অবসর-উত্তর ছুটি ৩০ জুন শেষ হয়ে ১ জুলাই অবসর হলে তিনি ১ জুলাই থেকে কার্যকর জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের সুবিধা পাবেন না।
এ ছাড়া কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়াই একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং তার চাকরি সন্তোষজনক হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবম বছরে ওই পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাবেন। তবে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া পদোন্নতি হিসেবে বিবেচিত হবে না।
নতুন প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বেতন বৃদ্ধির ধাপ, প্রেষণ ও বিভিন্ন ধরনের ছুটিতে থাকা কর্মীদের বেতন এবং উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে এভাবেই বিভিন্ন নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে।
/অ