দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরান-সমর্থিত হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোচা এবং লোহিত সাগরের প্রবেশমুখের গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ হাতছাড়া হয়েছে। হুথিদের এ অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়ে ইয়েমেন ও লোহিত সাগর ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য দ্বিতীয় যুদ্ধফ্রন্টে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মোচার দিকে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বিমান সহায়তার জন্য ইয়েমেনি সামরিক কর্মকর্তারা মরিয়া হয়ে সহায়তা চেয়েছিলেন। ইয়েমেনি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, হুথিরা বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে মোচার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। পরিস্থিতি জানিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁকে বলা হয়, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সৌদি আরবের বিমান সহায়তা আসছে।
কিন্তু সেই বিমান সহায়তা আর আসেনি। পরে মোচা হুথিদের দখলে চলে যায় বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
এর কয়েক ঘণ্টা পর শুক্রবার লোহিত সাগরের মুখে পেরিম দ্বীপও দখল করে হুথিরা। দ্বীপটি বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর তেহরানের প্রভাব আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে হুথিদের এ দ্রুত অগ্রযাত্রা এমন এক সংঘাতকে নতুন করে উসকে দিয়েছে, যা কয়েক বছর ধরে অনেকটাই স্থবির ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যেই গত কয়েক মাস ধরে ইয়েমেনে নতুন করে লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল।
ইরানের হরমুজ প্রণালির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং বাব আল-মান্দেবের ওপর হুথিদের বাড়তে থাকা নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
সুয়েজ খালগামী জাহাজ চলাচলের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব হরমুজ প্রণালির মতো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য অতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেলসহ বিপুল পরিমাণ পণ্য এ পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ এড়িয়ে সৌদি আরবের কিছু তেল রপ্তানি বাব আল-মান্দেব দিয়ে পরিচালিত হওয়ায় প্রণালিটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
ইয়েমেনের সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) শীর্ষ কর্মকর্তা আমর আল-বিধ বলেন, বাব আল-মান্দেব বন্ধ করতে হুথিদের অত্যাধুনিক অস্ত্রেরও প্রয়োজন নেই। সাধারণ একটি অস্ত্র দিয়েও তারা নৌযান চলাচল ব্যাহত করতে পারে। তাঁর মতে, এ সক্ষমতাই হুথিদের বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে এবং তারা এটি ধরে রাখবে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেন এবং হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার আহ্বান জানান বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প এতে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হননি বলে দাবি করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাসহ যুক্তরাষ্ট্রের মূল জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় তারা মনোযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক অংশীদারদের নেতৃত্ব দিতে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
মোচা দ্রুত হুথিদের দখলে চলে যাওয়া এবং সেখানে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে না ওঠায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মিত্রদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে। এক আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, এটি ইয়েমেনের ব্যর্থতা নয়; বরং ওয়াশিংটন ও রিয়াদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার ফল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা উপদেষ্টা মোহাম্মদ আল-বাশা মনে করেন, ইয়েমেনি নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ বিভক্তিও প্রতিরক্ষা দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ। তাঁর মতে, হুথিবিরোধী জোটে রাজনৈতিক ঐক্য নেই এবং ইয়েমেনে একক সামরিক নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি।
পশ্চিমা একটি সূত্রের দাবি, মোচায় হুথি যোদ্ধারা পৌঁছে দেখতে পান, ইয়েমেনি বাহিনীর ব্যাটালিয়নগুলো ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কাগজে-কলমে সেনাসদস্যদের সংখ্যা অনেক বেশি দেখানো হলেও বেতন নেওয়া অনেকের অস্তিত্ব বাস্তবে নেই। প্রকৃতপক্ষে বাহিনীর সক্ষমতা কাগজে থাকা সংখ্যার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ ছিল বলে ওই সূত্র দাবি করেছে।
ইয়েমেনে একসময় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত গত জানুয়ারিতে দেশটি থেকে তাদের অবশিষ্ট সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয়। সৌদি আরবের সঙ্গে বিরোধের জেরে আমিরাতকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছিল। এরপর সৌদি আরব সেই ঘাঁটি ও সেনা অবস্থানের শূন্যতা পূরণ করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসটিসির কর্মকর্তা আমর আল-বিধ বলেন, যারা প্রায় ১০ বছর ধরে ইয়েমেনে সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তাদের হঠাৎ চলে যেতে বলা এবং তাদের জায়গা পূরণ না করা কোনো সুসংগত কৌশল নয়; এটি দুর্বল ব্যবস্থাপনার পরিচয়।
ইয়েমেনি ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক দিন ধরে তিনি সেন্টকমকে বারবার সতর্ক করেছিলেন যে পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে উঠছে। এমনকি বৃহস্পতিবারও তিনি বিষয়টি জানিয়ে ছিলেন। তবে সেন্টকম অপারেশনাল নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এদিকে, তিন সপ্তাহ আগেই সৌদি সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছিল বলে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় বিমান নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাকারী গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সময়মতো মোতায়েন করা হয়নি। ফলে বড় ধরনের হামলা হলে যুদ্ধবিমান পরিচালনা ও নির্দেশনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলও প্রস্তুত ছিল না বলে পশ্চিমা একটি সূত্র দাবি করেছে।
মোচা ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক সহায়তার প্রেক্ষাপটে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দিতে ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা দেশটিতে পাঠানো হয়েছে। নতুন একটি যৌথ বাহিনী কমান্ডের আওতায় এসব মার্কিন সদস্য কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট এক মার্কিন কর্মকর্তার হিসাবে, সৌদি আরবে মোট মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় ২০০।
হুথিদের হাতে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থানের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় তাদের চলাচলের সুযোগ ও কৌশলগত প্রভাব আরও বেড়েছে। নতুন এসব অবস্থান থেকে নৌযান ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর সুযোগও তাদের বাড়বে।
এর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে—এমন প্রশ্নে ঝুঁকি বিশ্লেষক আল-বাশা বলেন, হুথিরা সম্ভবত পূর্ব দিকে অগ্রসর হবে। উপগ্রহচিত্র ও উন্মুক্ত উৎসের তথ্য অনুযায়ী, তারা নতুন করে সেনা ও সরঞ্জাম জড়ো করছে।
এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক উপদেষ্টা শুক্রবার ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রযাত্রাকে স্পষ্ট বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, এর মূল্য দিতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও ওয়াশিংটনের মিত্রদের।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/