দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

হংকংয়ের চীনা শাসন শুরুর পর প্রথম প্রধান নির্বাহী তুং চি-হুয়া মারা গেছেন। মঙ্গলবার রাতে ৮৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য হংকংয়ের নিয়ন্ত্রণ চীনের কাছে হস্তান্তরের পর তুং চি-হুয়া ব্রিটিশ গভর্নর ক্রিস প্যাটেনের কাছ থেকে দায়িত্ব নেন। এর মধ্য দিয়ে হংকংয়ে ১৫০ বছরের বেশি সময়ের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে।
তুংয়ের দায়িত্বকাল ছিল নানা সংকটে পরিপূর্ণ। এ সময় এশীয় আর্থিক সংকট, দুটি বড় মহামারি এবং ঐতিহাসিক গণবিক্ষোভের মুখোমুখি হয় হংকং। এসব ঘটনায় তাঁর প্রশাসন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০০৫ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার রাতে স্বজনদের উপস্থিতিতে তুং চি-হুয়ার মৃত্যু হয়। তাঁর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে দেশ ও জনগণের প্রতি নিবেদিত একজন ব্যক্তি হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
১৯৩৭ সালে সাংহাইয়ে জন্ম নেওয়া তুং যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যন্ত্র প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে জেনারেল ইলেকট্রিকে প্রায় এক দশক কাজ করেন।
১৯৬৯ সালে হংকংয়ে ফিরে বাবার মালিকানাধীন ওরিয়েন্ট ওভারসিজ শিপিং প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেন তিনি।
তুংয়ের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৯২ সালে। সে সময় তাঁকে ব্রিটিশ গভর্নর ক্রিস প্যাটেনের নির্বাহী পরিষদের সদস্য করা হয়।
রাজনীতিতে তেমন অভিজ্ঞতা না থাকলেও হংকংয়ে চীনা শাসন প্রতিষ্ঠার পর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বেইজিং তাঁকেই বেছে নেয় বলে মনে করা হতো। চীনের প্রতি তাঁর আনুগত্যের বিষয়টিও আলোচিত ছিল। বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি বৈশ্বিক মন্দার সময় চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো তাঁর পারিবারিক ব্যবসাকে সহায়তা করেছিল।
১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে গ্রেট হল অব দ্য পিপলসে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে তুংয়ের সঙ্গে হাত মেলান। সে সময় ব্যাপকভাবে প্রচারিত ওই ছবি তুংয়ের প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থনের প্রকাশ্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
তুং দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এশীয় আর্থিক সংকট আঘাত হানে। এতে হংকংয়ের আবাসন খাতে বড় ধরনের ধস নামে। তাঁর প্রশাসনকে আরও কয়েকটি জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করতে হয়। ১৯৯৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবের পর ২০০৩ সালে ছড়িয়ে পড়ে সার্স।
তবে তুংয়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয় ২০০৩ সালের জুলাইয়ে। ওই সময় প্রস্তাবিত জাতীয় নিরাপত্তা আইন নাগরিক অধিকার হুমকির মুখে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় পাঁচ লাখ হংকংবাসী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন।
ব্যাপক জনবিক্ষোভের মুখে তুংয়ের প্রশাসন প্রস্তাবিত আইনটি প্রত্যাহার করে নেয়। ওই ঘটনার প্রভাব তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তেও ছিল বলে মনে করা হয়। যদিও সে সময় তাঁর শারীরিক অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, কেউ কেউ মনে করেন, বেইজিংয়ের চাপেও তাঁকে সরে যেতে হয়েছিল।
এরপর ২০২০ সালে হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর করে চীন। কর্তৃপক্ষের দাবি, শহরে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইনটি প্রয়োজনীয়। তবে সমালোচকেরা এটিকে হংকংয়ের স্বাধীনতার অবসান হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন এবং এর ফলে শহরে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
২০২১ সালের জুলাইয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে সর্বশেষ জনসম্মুখে দেখা যায় তুংকে। কয়েক মাস পর তিনি হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার করান বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়। তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তান রেখে গেছেন।
হংকংয়ের সাবেক প্রধান নির্বাহীরাও তুংয়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত হংকংয়ের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করা লিয়াং চুন-ইং তাঁকে উদার ও মানুষের মন জয় করতে সক্ষম নেতা হিসেবে স্মরণ করেন।
২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বে থাকা ক্যারি ল্যাম বলেন, তুংয়ের নেতৃত্ব হংকংয়ের জন্য দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনা ঐতিহাসিক অবদান রেখেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া তুংকে দেশপ্রেমিক, বিশিষ্ট সমাজকর্মী এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেছে।
সিনহুয়া আরও জানিয়েছে, তুং চীনের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পরামর্শক সংস্থা চীনা জনগণের রাজনৈতিক পরামর্শ সম্মেলনের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে টানা চার মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/