দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

আফ্রিকা মহাদেশের প্রকৃত আয়তন আরও সঠিকভাবে তুলে ধরতে প্রচলিত বিশ্ব মানচিত্রের পরিবর্তে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ।
‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ শীর্ষক প্রস্তাবটি শুক্রবার টোগোর উদ্যোগে সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হয়। আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোর সমর্থন পাওয়া প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৬৪টি দেশ। এর মধ্যে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও রয়েছে। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এ সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক নয়। তবে এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহৃত মানচিত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।
ষোড়শ শতাব্দী থেকে বহুল ব্যবহৃত মারকেটর মানচিত্র নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। এ মানচিত্রে আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় সমান আকারের মনে হয়। অথচ প্রকৃতপক্ষে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
সমালোচকদের মতে, মানচিত্রের এ বিকৃতি আফ্রিকা ও নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশগুলোর উন্নয়ন প্রয়োজন, সম্পদ ও সম্ভাবনাকে তুলনামূলকভাবে ছোট করে দেখার মানসিকতা তৈরি করে।
ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর ১৫৬৯ সালে নৌপথে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের চলাচলে সহায়তার জন্য এ মানচিত্র তৈরি করেন। পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে দ্বিমাত্রিক মানচিত্রে পুরোপুরি নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব নয় বলেই এতে বিভিন্ন ধরনের বিকৃতি দেখা যায়।
মারকেটর মানচিত্রে পৃথিবীর বক্রতা দেখাতে গিয়ে নিরক্ষরেখার কাছের দেশগুলোকে তুলনামূলক ছোট এবং মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলকে বড় করে দেখানো হয়।
এ বিকৃতি কমাতে ২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ ‘ইকুয়াল আর্থ’ নামে একটি সমান-আয়তনভিত্তিক মানচিত্র তৈরি করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৪টি সদস্যদেশ এ মানচিত্র গ্রহণ করে। তখন তারা বলেছিল, বিশেষ করে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনসহ সব মহাদেশের আকার এ মানচিত্রে আরও সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
মানচিত্র পরিবর্তনের প্রচারণায় থাকা ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ নামের অনলাইন গোষ্ঠী বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো এবং ইউরোপের বড় একটি অংশ আফ্রিকার ভেতরে রাখলেও সেখানে আরও জায়গা অবশিষ্ট থাকবে।
ভোটের আগে টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসে বলেন, একটি ন্যায়সংগত বিশ্ব শুরু হয় একটি ন্যায়সংগত মানচিত্র দিয়ে। তিনি জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে বলেন, মানচিত্র কখনোই নিরপেক্ষ নয়। এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে দেয় এবং বিশ্বে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও মহাদেশের অবস্থান সম্পর্কে ধারণাকে প্রভাবিত করে।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারোও উদ্যোগটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মানচিত্র পরিবর্তন করলে অবশ্যই বিশ্ব বদলে যাবে না। তবে বাস্তবতাকে বিকৃত করে এমন একটি উপস্থাপনাকে সংশোধন করা সত্য প্রতিষ্ঠার একটি পদক্ষেপ।
তবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচ প্রস্তাবটির সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুসম্পর্কের মতো প্রকৃত সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে সাধারণ পরিষদ ষোড়শ শতাব্দীর মানচিত্র এবং এর সঙ্গে ক্ষতিপূরণ ও মানসিক ন্যায়বিচারের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করছে।
আফ্রিকা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আফ্রিকা নো ফিল্টার’-এর লেরাতো মোগোআতলে বলেন, বিশ্ব মানচিত্রে আফ্রিকার ভুল উপস্থাপন শুধু মানচিত্রগত ভুল নয়, এটি একটি বর্ণনাগত সমস্যাও। তাঁর মতে, আফ্রিকা সম্পর্কে বিশ্বের দীর্ঘদিনের ভুল তথ্য ও ধারণা দূর করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই মারকেটর মানচিত্র বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেনিয়ার ভূগোলবিদ কিওকো মুয়েন্দোর মতে, মারকেটর মানচিত্র পরোক্ষভাবে আফ্রিকার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, জনসংখ্যা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখিয়েছে। তাঁর ভাষায়, মানচিত্র শুধু ভ্রমণকারীদের পথ দেখায় না, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন অঞ্চলকে কীভাবে দেখা হবে, সেটিও প্রভাবিত করে।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/