দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরুর ছয় মাস পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধকে ‘ছোট্ট অভিযান’ বলেছিলেন, তা এখন গভীরভাবে অজনপ্রিয় এক অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি তার প্রেসিডেন্সির জন্যও বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো মারাত্মকভাবে ব্যাহত এবং সংঘাতের অবসানের কোনো স্পষ্ট পথও নেই। অথচ ট্রাম্প একসময় বলেছিলেন, যুদ্ধ চার সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে।
আরও সামরিক হামলা চালিয়েও ইরানের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছাড় আদায় করা যাবে না—এমন উপলব্ধির পর যুক্তরাষ্ট্র এখন আবার অর্থনৈতিক চাপের কৌশলে ফিরছে। ইরান সরকারকে আরও দুর্বল করার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্রদের জানিয়েছেন, ‘আপাতত’ নতুন হামলা চালানোর সম্ভাবনা কম।
যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক মূল্য
শুরু থেকেই যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় ছিল, সময়ের সঙ্গে তা আরও বেড়েছে। রয়টার্স ও ইপসসের জরিপ অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর ট্রাম্পের জনসমর্থন ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে মার্কিনদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালানো ট্রাম্পের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। তবে বেশির ভাগ ভোটারকে তিনি এ যুক্তিতে রাজি করাতে পারেননি। জরিপে মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন।
একই পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অন্যান্য যুদ্ধের তুলনায় এ সমর্থন কম। গ্যালাপের জরিপে দেখা গেছে, আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক বছর ধরে ৫০ শতাংশের বেশি সমর্থন ছিল।
দাম বাড়ায় ভোটারদের ক্ষোভ আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে তাদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করতে হবে।
এ যুদ্ধ রিপাবলিকানদের মধ্যেও বিভাজন বাড়িয়েছে। একদল দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চায়, অন্যদিকে কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা তেহরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা, তবে আশঙ্কার চেয়ে কম
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়। ইরান ও ওমানের মধ্যে এই প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থ প্রায় ৩৪ কিলোমিটার। যুদ্ধের শুরুতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার শঙ্কা দেখা দেয়।
ক্ষতি হয়েছে উল্লেখযোগ্য, তবে অর্থনীতিবিদদের প্রাথমিক আশঙ্কার তুলনায় তা কম। যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল দুই দফায় বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। এখন সংস্থাটি চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৩ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করছে। জানুয়ারিতে এ পূর্বাভাস ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
তবে ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের সময়ের তুলনায় বিশ্ব অর্থনীতি এবার বেশি স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দিয়েছে। বড় অর্থনীতিগুলো আগের চেয়ে কম জ্বালানিনির্ভর। পাশাপাশি শক্তিশালী ভোগ ও বিনিয়োগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাখাতে চলমান উত্থান ধাক্কা সামাল দিতে সহায়তা করেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ইরান, তবে পরাজিত নয়
ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে তেহরান এখনো হামলা চালাতে সক্ষম এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ক্ষমতাও ধরে রেখেছে।
মে মাসে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার কংগ্রেসকে জানান, মার্কিন বাহিনী ইরানের ১৬১টি নৌযান ধ্বংস করেছে এবং দেশটির ৮২ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকার্যকর করেছে। তিনি বলেন, আগে ইরানের বিমানবাহিনী প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০০টি উড্ডয়ন পরিচালনা করলেও এখন আর কোনো অভিযান চালাচ্ছে না।
তবু ইরানের হাতে এখনো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। দেশটি অঞ্চলজুড়ে জাহাজ ও মার্কিন সামরিক স্থাপনায় সফলভাবে হামলা চালিয়েছে।
মার্চে রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবে ইরানের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারের মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করতে পেরেছে। আরও এক-তৃতীয়াংশের অবস্থা স্পষ্ট নয়। সে সময় সূত্রগুলো জানিয়েছিল, বোমা হামলায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস অথবা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও বাংকারের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে।
যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে, বেড়েছে মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাহত হয়েছে বাণিজ্য। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৮ শতাংশে পৌঁছায়।
তবে যুদ্ধ দেশটির রাজনৈতিক বিভাজনকে আড়ালে ঠেলে দিয়েছে এবং ভিন্নমত দমনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য, ঝুঁকিতে মার্কিন মিত্ররা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে হুমকি হিসেবে দুর্বল করা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে উল্টো তেহরান আরও সাহসী হয়েছে এবং অঞ্চলটি আগের চেয়ে কম নিরাপদ হয়ে পড়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার লক্ষ্য হয়েছে মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনা এবং ব্যাহত হয়েছে আকাশপথে চলাচল।
জাহাজে ইরানের হামলার পাশাপাশি লোহিত সাগরে সৌদি আরব-সংশ্লিষ্ট নৌযান লক্ষ্য করে হুথিদের অবরোধে পুরো অঞ্চলে বিমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট জাহাজে হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলোর অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ইরানের সময় বাড়তে পারে
২০২৫ সালের জুনে আগের এক দফা হামলা এবং চলমান যুদ্ধের শুরুর পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের পরিচিত তিনটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং অস্ত্রসংক্রান্ত কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা কয়েকটি স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসরায়েলি হামলায় কয়েকজন শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীও নিহত হয়েছেন।
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়, একটি বোমার জন্য প্রয়োজনীয় বিভাজ্য উপাদান তৈরিতে ইরানের সময় এখন সর্বোচ্চ এক বছর লাগতে পারে। যুদ্ধের আগে এই সময় ছিল সর্বোচ্চ ছয় মাস।
ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানোই যুদ্ধের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রকৃত অবস্থা এখনো অনিশ্চিত। কারণ জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা এখনো দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ফিরে যেতে পারেননি। ২০২৫ সালের হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের অবস্থান যাচাই করতে পারেনি। এই মজুত গোপন কোনো স্থাপনায় আরও সমৃদ্ধ করে অস্ত্র তৈরির উপযোগী পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
তবে ইরান দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
কমেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ সামরিক সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
ইরানের হামলা ও দুর্ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র হারিয়েছে ড্রোন ও যুদ্ধবিমান। মে মাসে কংগ্রেসীয় গবেষণা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২টি সামরিক বিমান হারিয়েছে।
গোলাবারুদের মজুতও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু অত্যাধুনিক নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের বিশ্বব্যাপী মজুতের ‘প্রায় সবটাই’ ব্যবহার করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করেছে। একই সময়ে উচ্চ উচ্চতায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমেছে অন্তত ৩৮ শতাংশ।
যুদ্ধের কারণে ইউরোপ ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিয়েছে ওয়াশিংটন। এতে মোতায়েনের সময় বাড়ছে এবং বিশ্বের অন্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময়, এক বছরেরও বেশি মোতায়েন ছিল। টানা ২০০ দিন সমুদ্রে থাকার পর ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানান আইনপ্রণেতারা।
গত সপ্তাহে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আনা আরেকটি বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, ছয় মাসের এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর কতটা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
/অ