দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের ওপর ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, নতুন এই পদক্ষেপ নেওয়া হলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রয়োজন কমে আসতে পারে।
বৃহস্পতিবার বেসেন্ট এ কথা বলেন। এর এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ শুরুর হুমকি দেন। একই সঙ্গে ইরানকে যেকোনো ধরনের আর্থিক বা অন্য সহায়তা দেওয়া দেশকেও অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। বেসেন্ট জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত জানানো হবে।
মার্কিন হুমকির পর বৃহস্পতিবার তেলের দাম তিন সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল আটকে পড়েছে। এই সংঘাত বন্ধে ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে বেসেন্ট বলেন, ‘তেলের দাম কেন বেড়েছে, তা আমি নিশ্চিত নই। আমরা যদি সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করি, তাহলে সম্ভবত বড় পরিসরে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রয়োজন হবে না।’
এই সংঘাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোও এতে জড়িয়ে পড়েছে এবং বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফেব্রুয়ারির আগে বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং সংঘাতের অবসানের লক্ষ্যে এপ্রিল ও জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দফা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। তবে উভয় চুক্তিই দ্রুত ভেঙে পড়ে।
আগামী সোমবার সংবাদ সম্মেলনে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিস্তারিত জানাবেন বলে জানিয়েছেন বেসেন্ট। তিনি বলেন, ‘এটি দ্বিমুখী আঘাত। ইরানের ওপর আমাদের অবরোধ রয়েছে এবং এর সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হবে।’
গত এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে, যা জুনের মাঝামাঝি এক মাসের জন্য স্থগিত রাখা হয়।
বেসেন্ট বলেন, ‘এটি ইরানে কাজ করবে এবং আমরা এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাব। আমাদের মিত্র ও বিশ্বের অন্যদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।’
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রায় ৫০ বছর ধরে ইরান প্রায় অবিরাম কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।
বেসেন্টের বক্তব্যের আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানায়। তারা এসব পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, ইরানের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ়তায় সামান্যতম দ্বিধাও তৈরি করতে পারবে না এসব নিষেধাজ্ঞা।
বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপথে রপ্তানি করা ইরানি তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে চীন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ সরবরাহকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রে বড় রপ্তানিকারক চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংঘাত আরও বাড়ালে ওয়াশিংটনকে পাল্টা পদক্ষেপের মুখে পড়তে হতে পারে।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করার কারণে চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, অনেক আলোচনা গোপনেই হওয়া ভালো। তিনি বলেন, চীন তার জ্বালানির প্রায় ৫০ শতাংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পায়। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সহযোগিতা করা তাদের জন্যও বড় সুবিধার হবে।
এদিকে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যার সমাধানে সহায়ক নয়।’ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে চীন।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প নজিরবিহীন মাত্রায় ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার’ হুমকি দেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবে বা কোন দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। যদিও ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা মধ্যস্থতায় সহায়তাকারী যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ক্ষেত্রেও এই সতর্কতা প্রযোজ্য হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যে কোনো দেশ তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থাকে ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দিতে দেবে, তাদেরও ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে।’
তবে দেশে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা যুদ্ধ বন্ধের জন্য ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছেন। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে তার জনপ্রিয়তা কমছে এবং নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে তার দলের নিয়ন্ত্রণও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ট্রাম্পের মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আর্থিক সমস্যা থেকে জনমত ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রেকর্ড ঋণ ও ক্রমবর্ধমান সুদের হারের মতো সমস্যার মধ্যে এই বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।
আরাঘচি বলেন, ব্যর্থ নীতিতে ওয়াশিংটনের অব্যাহত জোরাজুরি আরও ব্যর্থতা ডেকে আনবে এবং ইরানি জনগণকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেবে।
তবে ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া হুমকি ও ঘোষণাগুলো সব সময় ঘোষিত রূপে বাস্তবায়িত হয় না।
/অ