দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতের অনগ্রসর ও জরাজীর্ণ সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা পরিদর্শন ও সংস্কারের দাবিতে নতুন কর্মসূচি শুরু করেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের পর এবার দেশটির সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলগুলোকে আন্দোলনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছে সংগঠনটি।
গত ১৩ আগস্ট পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কারিসুন্দা গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান ২৬ বছর বয়সী আবদুল হাফিজ। স্কুলটি তার সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশটির সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা যাচাই করতে সিজেপির ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি।
হাফিজের অভিযোগ, স্কুল পরিদর্শনের কয়েক ঘণ্টা পর স্থানীয় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কর্মীরা তার বাড়িতে গিয়ে তাকে ও তার বাবা মোহাম্মদ মাফিককে মারধর করেন। দুই দিন পর ৫১ বছর বয়সী মাফিক আহত অবস্থায় মারা যান।
রোববার বিজেপিশাসিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুবেন্দু অধিকারী দাবি করেন, হামলাকারীরা অপরাধী এবং তাদের সঙ্গে বিজেপির কোনো সম্পর্ক নেই। একই সঙ্গে তিনি এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
তবে বাবার দাফনের এক দিন পর আল জাজিরাকে হাফিজ বলেন, তিনি জবাবদিহি ও সরকারি স্কুলে সংস্কারের দাবি থেকে সরে আসবেন না। তিনি বলেন, বাবার হত্যার বিচারের জন্য তারা লড়বেন, তবে এই হামলা তাদের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবি থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
সিজেপির জন্য এই দাবি এখন আন্দোলনের নতুন দিক উন্মোচন করেছে। দিল্লিতে দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে মোদি সরকারকে চাপে ফেলার পর এবার দেশটির সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা সামনে আনতে মাঠে নামছে সংগঠনটি। সংগঠনটির নেতারা দেশজুড়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সমর্থকদের নিজ নিজ এলাকার সরকারি স্কুল পরিদর্শন করে সেগুলোর অবস্থা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন।
‘ফিক্স দ্য স্কুলস’ নামে এই কর্মসূচিতে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো নিরাপদ পানীয় জল ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার, বিদ্যুৎ ও ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষ, সীমানাপ্রাচীর ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং দুপুরের খাবার ও শিক্ষকদের উপস্থিতি।
পশ্চিমবঙ্গে হাফিজের বাবার মৃত্যুর ঘটনায় আন্দোলনের ঝুঁকিও বেড়েছে। একদিকে বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো, অন্যদিকে সীমিত সংগঠন ও জনবল নিয়ে সিজেপির আন্দোলন—দুই পক্ষের এই দ্বন্দ্বে উত্তেজনা বাড়ছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, আবদুল পশ্চিমবঙ্গের যে সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন, সেটির অবস্থা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। শুধু ভালো স্কুলের দাবি তোলার কারণে একজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে—এটি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হওয়ার মতো বিষয়।
সিজেপির সহসমন্বয়ক আশুতোষ রাঙ্কা সোমবার হাফিজের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। পরে তিনি জানান, সংগঠনটি সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানাতে চায়। তবে হাফিজ তার বাবার নামে একটি স্কুলের নামকরণের দাবি জানিয়েছেন।
রাঙ্কার নিজ রাজ্য রাজস্থানের আলওয়ারেও সংগঠনটি সরকারি স্কুলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কর্মসূচি পালন করেছে। গত ১৪ আগস্ট তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও নিরাপদ পানীয় জলের দাবি জানান। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, পরে কর্মকর্তারা এসব দাবি মেনে নেন।
তবে রোববার বিজেপিশাসিত রাজস্থান সরকার সরকারি স্কুলে বহিরাগতদের প্রবেশ এবং ছবি ও ভিডিও ধারণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তার কথা উল্লেখ করে দেওয়া সরকারি নির্দেশনায় এসব নিয়ম লঙ্ঘন করলে স্কুল কর্তৃপক্ষকে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। রাজ্যজুড়ে সিজেপির স্বেচ্ছাসেবকদের স্কুল পরিদর্শনের ঘোষণা দেওয়ার পরই এ নির্দেশনা আসে।
শিক্ষানীতি বিশেষজ্ঞ সামিনা বানোর মতে, ভারতের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাঠামোই মানুষের জন্য যথাযথভাবে কাজ করছে না। গত ১০ বছরে বিভিন্ন পরিদর্শনে তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মাদকাসক্ত শিক্ষক, প্রত্যন্ত এলাকায় ভুয়া নিয়োগ এবং শিক্ষকদের দুর্গম এলাকায় যেতে অনীহাসহ নানা সমস্যা দেখেছেন বলে জানান।
তার মতে, সরকারি স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশেষ করে শিক্ষাদানের মান, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল এবং দুপুরের খাবারের মান নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। সিজেপি এসব বিষয়কে মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে শুধু দাবি তোলা যথেষ্ট নয় বলেও সতর্ক করেন তিনি। মানুষের দাবিকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে হলে কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে এবং ভারতের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
এদিকে দিল্লিতে জেন-জি আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণেরা রাজপথ থেকে ফিরে যাওয়ার পর বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি স্কুলের উন্নত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার দাবিতে শিক্ষার্থীদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও তারা সড়ক অবরোধ করেছে, কোথাও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যালয় ঘেরাও করেছে, আবার কোথাও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছে।
দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলীর মতে, সিজেপি এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনের নতুন পর্যায় ঘোষণা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর সংগঠনটির জন্য এটি কার্যকর কৌশল, কারণ প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো বড় স্বেচ্ছাসেবক কাঠামো না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কাজ ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
তবে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, আন্দোলনের প্রস্তুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তাদের সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যেও ফেলতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে হাফিজের পরিবারের ওপর হামলার ঘটনাকে এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন তিনি।
এরপরও আন্দোলন থেকে সরে আসেনি সিজেপি। মঙ্গলবার রাঙ্কা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার একাধিক ভেন্যুতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য তাদের অনুমতি বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, এতে বিজেপি ‘ককরোচ’ আন্দোলনকে ভয় পাচ্ছে বলেই প্রমাণ হচ্ছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের সিজেপি সমর্থকেরা সরকারি স্কুল পরিদর্শন অব্যাহত রাখবেন এবং সেগুলোর সমস্যা সমাধানে রাজ্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন বলেও জানান তিনি।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/