দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। ওয়াশিংটনের সঙ্গে করা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে মার্কিন স্থল অভিযান মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে ইরান।
রোববার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি বলেন, দেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে তাঁর বাহিনী প্রস্তুত। জুনে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। গত মাসে আবারও সংঘাত শুরু হওয়ায় এমওইউ কার্যত ভেঙে পড়ে এবং সোমবার এর আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
জাভানি বলেন, শত্রুরাই যুদ্ধ শুরু করেছে এবং এখন পর্যন্ত ইরানের কর্মকাণ্ড ছিল প্রতিরক্ষামূলক। তবে পরিস্থিতির প্রয়োজনে তা আক্রমণাত্মক রূপ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে শত্রুপক্ষকে কৌশলগত চমকের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তবে কী ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি জাভানি। এর আগে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালালে দেশটির জ্বালানি নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত অবকাঠামোসহ যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের স্থাপনা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও গণমাধ্যমগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন স্বার্থে স্থল হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা এমন অভিযানের বাস্তবতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন সাম্প্রতিক কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গত সপ্তাহে আইআরজিসির শীর্ষ সামরিক ও নিরাপত্তা পদে একাধিক পুরোনো ঘরানার কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছেন। আইআরজিসির নতুন কমান্ডার মেজর জেনারেল আহমাদ ভাহিদির নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রতিরোধক্ষমতার পাশাপাশি শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ভাহিদি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর সংঘাতে ইরানের নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীকেও পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও শুক্রবার দাবি করেন, যুদ্ধে ইরান পরাজিত হয়েছে এবং দেশটির ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ ইস্পাতের দেয়ালের মতো কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালিকে শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করার হুমকিও দেন। পরে হোয়াইট হাউস তাঁর মন্তব্যকে কৌতুক হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি ঘোষণা দেন, ইরানের মাটিতে কোনো মার্কিন সেনা স্থল অভিযানে অংশ নিলে কোনো পুরুষ মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটক করতে পারলে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। কোনো নারী এ কাজ করলে পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ হবে বলেও জানান তিনি।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়িও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করেছিল। তবে পরিকল্পনা অপরিপক্ব হওয়ায় তা বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে দাবি তাঁর।
রেজায়ী বলেন, জুলাইয়ের দুই সপ্তাহের সংঘাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তেহরান বা উত্তর ইরানে সরাসরি হামলা না চালিয়ে ১৫টি প্রদেশের প্রায় ৫০টি শহরে হামলা চালায়। তাঁর মতে, এসব বিমান হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের প্রস্তুতি এবং ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় পৌঁছানোর পথ তৈরি করা।
তবে এমন স্থল অভিযানের জন্য বিপুলসংখ্যক সেনা প্রয়োজন হবে বলেও দাবি করেন তিনি। ইরানি সংবাদমাধ্যম ও সামরিক কর্মকর্তারা দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ রক্ষায় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানি ভূখণ্ডে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ-রেজা আকরামিনিয়া বলেন, কোনো বিদেশি সেনাকে ইরানের ভূখণ্ডে অবতরণ করতে না দেওয়াই হবে তাদের লক্ষ্য।
এদিকে এমওইউর মেয়াদ শেষ হলেও এর গুরুত্ব নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে ইরান। আইআরজিসির রাজনৈতিক প্রধান জাভানি বলেন, জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের যেসব প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলবে না।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এমওইউতে যুদ্ধ বন্ধের জন্য নির্দিষ্ট দুই মাসের সময়সীমার কথা সরাসরি উল্লেখ নেই। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, কোনো চাপ, আলটিমেটাম বা সময়সীমার ভিত্তিতে ইরান তার নীতি নির্ধারণ করে না। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
হরমুজ প্রণালির আংশিকভাবে পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনাও চলছে বলে জানান বাঘাই। তবে আইনি ও কারিগরি জটিলতা, একাধিক পক্ষের সম্পৃক্ততা এবং প্রক্রিয়াটি ব্যাহত করার চেষ্টা থাকায় এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এমওইউকে কূটনীতির ক্ষেত্রে ইরানের গর্ব ও বিজয়ের দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিক—দুই দিক থেকেই ইরান বিজয়ী হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে এখনো ইরানের নেতৃত্বকে রাজি করাতে পারেননি গালিবাফ। ফলে এমওইউর মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/