দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতে জনপ্রিয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেসে (ইউপিআই) ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফি নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রায় এক দশক ধরে বিনা ফিতে চলা দেশটির ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সরকার এখনো ফি-এর হার বা কোন ধরনের লেনদেনে এটি কার্যকর হবে, তা চূড়ান্ত করেনি। তবে আলোচনায় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি লেনদেনে শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এই ফি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লেনদেন প্রক্রিয়াকারী ব্যাংক ও পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নেবে।
সরকার জানিয়েছে, ভোক্তা ও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে ইউপিআই লেনদেন আগের মতোই বিনা ফিতে থাকবে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমার বেশি কিছু লেনদেনে নামমাত্র হারে ফি আরোপের কথা ভাবা হচ্ছে। ফলে অধিকাংশ ছোট অঙ্কের ইউপিআই লেনদেন বিনামূল্যেই থাকবে।
তবে ইউপিআইয়ের ওপর ফি আরোপের সিদ্ধান্ত এর ব্যাপক জনপ্রিয়তায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৬ সালে চালু হওয়ার পর ইউপিআই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তাৎক্ষণিক ডিজিটাল পেমেন্ট নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসেই ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ২৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন লেনদেন হয়েছে, যার মোট মূল্য ২৯ দশমিক ৮৭ ট্রিলিয়ন রুপি। আর্থিক হিসাবে সদ্য শেষ হওয়া বছরে লেনদেনের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪১ দশমিক ৬ বিলিয়ন। বর্তমানে ৫৫ কোটির বেশি মানুষ ইউপিআই ব্যবহার করেন। ভারতের বাইরেও ১১টি দেশে কোনো না কোনোভাবে এ ব্যবস্থা ব্যবহার করা যাচ্ছে।
ইউপিআইয়ের সাফল্যের অন্যতম কারণ এর উন্মুক্ত কাঠামো। একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বদলে বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে একই নেটওয়ার্কে সেবা দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে ভারত। ফলে গুগল পে ও ফোনপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করলেও তাদের ব্যবহারকারীরা একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারেন।
এই ব্যবস্থার বিস্তারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ। সবজি বিক্রেতা, ট্যাক্সিচালক কিংবা ছোট দোকানদারদের ইউপিআই গ্রহণের জন্য কার্ড মেশিন কেনার প্রয়োজন হয় না। একটি ছাপানো কিউআর কোড দিয়েই তারা অর্থ গ্রহণ করতে পারেন। আর এতদিন মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট না থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে ইউপিআই পেমেন্ট নিতে ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহও ছিল কম।
অর্থনীতিবিদ অভিনব মাদারাম ও শ্যারন বুটোর গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবসায়ীদের ইউপিআই গ্রহণের বিস্তার শুধু এর জনপ্রিয়তার ফল নয়; বরং এই বিস্তারই ইউপিআই ব্যবহারের অন্যতম চালিকাশক্তি। যেসব এলাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইউপিআই গ্রহণের হার বেশি, সেসব এলাকায় এর ব্যবহারও তুলনামূলক বেশি।
আলোচনায় থাকা একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, ২ হাজার রুপির বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে ফি আরোপ করা হতে পারে। এতে ছোট ব্যবসা ও কম মূল্যের লেনদেনের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান জেফরিজের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার রুপির বেশি লেনদেন মার্চেন্ট পর্যায়ের মোট লেনদেনের মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ হলেও মোট লেনদেনমূল্যের প্রায় ৬৭ শতাংশ।
এভাবে ফি চালু করা হলে ব্যাংক ও পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে একটি হিসাবে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ছোটখাটো লেনদেনের ক্ষেত্রে এর প্রভাবও সীমিত রাখা সম্ভব হবে।
ইউপিআই ব্যবহারকারীদের কাছে বিনামূল্যের মনে হলেও এর পরিচালনায় বড় ধরনের ব্যয় রয়েছে। সার্ভার পরিচালনা, লেনদেন নিষ্পত্তি, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং সাইবার হামলা থেকে ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে নিয়মিত অর্থ ব্যয় হয়। এতদিন সরকার ব্যাংক ও পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের সেবা দেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রাও সম্প্রতি বলেছেন, এই ব্যবস্থার খরচ কাউকে না কাউকে বহন করতেই হবে।
তবে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর ফি আরোপ করা হলে এর প্রভাব বড় হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। বিশেষ করে অল্প মুনাফায় পরিচালিত ছোট দোকান ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীদের জন্য সামান্য ফিও ইউপিআই গ্রহণের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ব্যবসা বা বড় অঙ্কের লেনদেনে ফি সীমাবদ্ধ রাখা হলে ইউপিআইয়ের ব্যাপক ব্যবহারে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কিন্তু ছোট ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীদের ওপর ফি আরোপ করা হলে নতুন ব্যবসায়ীদের ইউপিআই নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার গতি কমে যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইউপিআই ব্যবস্থাকে আর্থিকভাবে টেকসই করা, একই সঙ্গে এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার পেছনে থাকা সুবিধাগুলো অক্ষুণ্ন রাখা। ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা পিক্সের উদাহরণও এ ক্ষেত্রে সামনে আনা হচ্ছে। ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের জন্য এটি বিনামূল্যে হলেও ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে কম হারে ফি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে ১৪ কোটি মানুষ ও ১ কোটি ৪০ লাখ প্রতিষ্ঠান পিক্স ব্যবহার করছে।
তবে ইউপিআই ব্যবহারকারীদের মধ্যে ফি আরোপের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ২০২৪ সালের লোকালসার্কেলসের এক জরিপে ৭৫ শতাংশ ইউপিআই ব্যবহারকারী জানিয়েছিলেন, লেনদেনে ফি চালু হলে তারা এ ব্যবস্থা ব্যবহার বন্ধ করে দেবেন। বিপরীতে মাত্র ২২ শতাংশ ব্যবহারকারী ফি দিতে রাজি থাকার কথা জানিয়েছিলেন।
ফলে ভারতের ইউপিআই ব্যবস্থার পরবর্তী পরীক্ষা শুধু ফি আরোপ করা নয়; বরং এমন একটি মূল্য কাঠামো তৈরি করা, যাতে বড় ব্যবসা থেকে রাজস্ব আসে, অথচ ছোট ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে নিরুৎসাহিত না হন।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/