দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কাবুল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল প্রত্যাহার এবং তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর আফগানিস্তান বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক ও মানবাধিকার সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরও দেশটির লাখো মানুষ এখন ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগব্যাধি ও কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। দেশটির প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষেরই মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। একসময় আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় সহায়তাদাতা যুক্তরাষ্ট্র এখন শীর্ষ পাঁচ দাতাদেশের মধ্যেও নেই।
সহায়তা কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নারী ও শিশুদের ওপর। বিশেষজ্ঞরা তালেবানের নারী অধিকারবিরোধী নীতিকে ‘লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর শিক্ষাগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইউনেস্কোর হিসাবে, বর্তমানে প্রায় ২৪ লাখ আফগান মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
নারীদের অধিকাংশ চাকরি থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখা এবং দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণের ক্ষেত্রে পুরুষ অভিভাবকের সঙ্গে থাকার মতো কঠোর বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেন জানিয়েছে, আফগানিস্তানের অর্ধেক নারী এখন মাসে মাত্র এক বা দুইবার বাড়ির বাইরে বের হন। এর ফলে নারীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও তীব্র হচ্ছে। সংস্থাটির হিসাবে, ১০ জনের মধ্যে সাতজন নারী নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা খারাপ বা খুব খারাপ বলে মনে করেন।
আফগান নারী অধিকারকর্মী মাহবুবা সেরাজ পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, নারীদের অধিকারের প্রায় সবই কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি দেশ ছাড়ার কথাও ভাবছেন।
নারীদের ওপর সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি তালেবানের জারি করা বিভিন্ন নির্দেশনার সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এসব নির্দেশনা নারীদের বৈবাহিক অধিকার সীমিত করার পাশাপাশি শিশুবিবাহের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এরই মধ্যে আফগানিস্তানের মানবিক সহায়তার অর্থায়ন ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। ইউএন উইমেনের হিসাবে, ১ কোটি ৭ লাখের বেশি আফগান নারী ও মেয়ে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের জরিপে অংশ নেওয়া নারী নেতৃত্বাধীন সংস্থাগুলোর অর্ধেকের বেশি জানিয়েছে, অর্থের অভাবে আগামী এক বছরের মধ্যে তাদের কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিত করতে হতে পারে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে শিশুরা। সেভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের প্রতি ১০ শিশুর একজন তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। ইউনিসেফের হিসাবে, চলতি বছর ১ কোটি ১০ লাখের বেশি শিশুর মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। অর্থের অভাবে দেশটিতে প্রায় ৬০০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে আফগানিস্তানের সংকট শুধু মানবিক সহায়তার ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতিও দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল। বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় সরকারি ব্যয় পরিচালনার সক্ষমতা কমেছে। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগে দেশটির সরকারি ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই বিদেশি সহায়তার মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
মাদক অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালে তালেবান পপি চাষ নিষিদ্ধ করার পর আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদন প্রায় ৯৫ শতাংশ কমেছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় এটিকে অবৈধ মাদক উৎপাদন কমার ইতিহাসে অন্যতম বড় পতন হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকায় এতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সিনথেটিক মাদক, বিশেষ করে মেথামফেটামিনের উৎপাদন ও পাচার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তালেবান সরকার ধীরে ধীরে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। রাশিয়া গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। চীনও আফগানিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে। দেশটির তেল, তামা ও লিথিয়ামসহ বিভিন্ন খাতে চীনা কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ছে।
তবে তালেবান শাসনের অধীনে আফগানিস্তান পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি বা ২০২১ সালে যে ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তারপরও দুর্বল প্রতিষ্ঠান, গভীর দারিদ্র্য এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় আইএসআইএস-কে ও আল-কায়েদার মতো গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পর দেশটির পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। দুই দশকের মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের যে প্রতিশ্রুতিগুলো একসময় আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের কথা বলেছিল, তার অনেকটাই এখন বিপরীত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ক্ষুধা, প্রতিরোধযোগ্য রোগ, দারিদ্র্য ও নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই লাখো আফগানের জীবন কাটছে।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/