দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার ৯৭ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়েছে। দেশটির অর্থনীতিকে আধুনিক ও বাজারমুখী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ঝু রংজি তার স্পষ্টভাষী বক্তব্য ও কঠোর সংস্কারের জন্যও পরিচিত ছিলেন।
২০১১ সালে তার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত উপপ্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকাকালের বক্তব্য নিয়ে চার খণ্ডের সংকলন প্রকাশিত হয়। বইটিতে তার প্রায় ২ হাজার ৪২ পৃষ্ঠার বক্তব্য ছিল, যার অনেকগুলোই আগে প্রকাশ্যে আসেনি।
সংকলনটি প্রকাশের পর চীনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ, সে সময়ের অনেক নেতার সতর্ক ও সংযত বক্তব্যের বিপরীতে ঝু রংজি ছিলেন সরাসরি ও স্পষ্টভাষী। নিম্নমানের বাঁধ নির্মাণকারীদের তিনি ‘পরজীবী’ এবং ভুল করা ব্যাংকারদের ‘অর্ধবুদ্ধি’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
তবে তার বক্তব্যের জনপ্রিয়তা শুধু ব্যক্তিত্বের কারণে ছিল না। চীনের অর্থনীতিতে সে সময় যে সমস্যাগুলো ছিল, ঝু রংজির বক্তব্যেও সেগুলোর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। স্থানীয় সরকারের ঋণ, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক ঋণ, মূল্যস্ফীতি, দ্রুত নগরায়ণ ও দুর্নীতি ছিল তার আলোচনার অন্যতম বিষয়।
১৯৯৮ সালের শুরুর দিকে এক বক্তব্যে ঝু বলেছিলেন, চীন এমন অনেক সম্ভাব্য সংকটের মুখোমুখি, যা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। সাধারণ মানুষের অসন্তোষের কারণ হিসেবে তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, ধনী-গরিবের বৈষম্য এবং কিছু স্থানীয় কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারিতার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
বেইজিংয়ের খ্যাতনামা সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা ঝু ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। একই বছর মাও সে তুং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ঝু রংজিকে গ্রামাঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল। পরে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়ে তিনি ধীরে ধীরে দল ও সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসেন। ১৯৮৭ সালে তিনি সাংহাইয়ের মেয়র হন। তার মেয়াদকালেই সাংহাইয়ের বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়।
১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারে যোগ দিতে বেইজিংয়ে চলে যান ঝু। সেখানে তিনি এমন কিছু অর্থনৈতিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের সংকটের সময় চীনের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করে এবং পরবর্তী সময়ে দেশটিকে উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হওয়ার পথ তৈরি করে।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠা চীনের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনেন ঝু। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বহু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নেন। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারান। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নেওয়া এবং আবাসন মালিকানা সংস্কারের উদ্যোগও তার সময়েই নেওয়া হয়। এসব সংস্কারের পর চীনে দ্রুত আবাসন ও সম্পত্তি ব্যবসার প্রসার ঘটে।
তার সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি ছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদান। দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার পর ২০০২ সালে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময় অনেক চীনা কর্মকর্তা আশঙ্কা করেছিলেন, সদস্য হওয়ার জন্য ঝু এত বেশি ছাড় দিয়েছেন যে এতে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে ঝু রংজির শাসনকালকে সবাই পুরোপুরি সফল মনে করেননি। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, শস্যনীতি, কর বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় কারখানা বন্ধের ক্ষেত্রে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকারকে বিভিন্ন সমস্যা সামাল দিতে বাধ্য করেছে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপলস ডেইলির সাবেক জ্যেষ্ঠ সম্পাদক ঝৌ রুইজিন ২০১১ সালে বলেছিলেন, ঝু রংজির সময়টি ছিল বড় ধরনের সংস্কারের যুগ। তার মতে, ওই সময়ে বাজার অর্থনীতির পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য সাহসী ও ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত একটি প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি হয়েছিল।
ঝু রংজির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বের অবসান হলো।
/অ