দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শীর্ষ উপদেষ্টা আলি আকবর ভেলায়াতি ফের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানের মিত্ররা চাইলে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ করে দিতে পারে। তার এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন ইরানের পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ দেওয়া এক বার্তায় ভেলায়াতি বলেন, ‘বাব আল-মান্দেবের বর্তমান নিরাপত্তা শত্রুপক্ষকে ভুল হিসাব করার সুযোগ করে দেওয়া উচিত নয়। প্রতিরোধ অক্ষের উভয় জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।’ তার উল্লেখ করা ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের হুথি, গাজার হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী।
এর আগেও ভেলায়াতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বাব আল-মান্দেব বন্ধের হুমকি দিয়েছিলেন। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির পর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলার পর আবারও একই সতর্কবার্তা দিলেন তিনি।
গত ৭ জুন রাত থেকে ইরান ও ইসরায়েল পরস্পরের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে। এতে নাজুক যুদ্ধবিরতি নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো শান্তি আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়ে আসছেন এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই অগ্রগতির আশা প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরান অধিকাংশ দেশের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এরপর ১৩ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর এবং হরমুজ অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপ করলে ওই পথে চলাচল আরও কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবও বন্ধ হয়ে গেলে শুধু চলমান যুদ্ধই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হবে। এর প্রভাব পড়বে শিল্পকারখানা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার এবং জ্বালানির দামে।
ইয়েমেনের উত্তর-পূর্বে এবং আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলের জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সবচেয়ে সরু অংশে এর প্রস্থ মাত্র ২৯ কিলোমিটার। সেখানে জাহাজ চলাচলের জন্য দুটি পৃথক পথ রয়েছে। এই কৌশলগত জলপথ কার্যত ইরান-সমর্থিত হুথিদের নিয়ন্ত্রণে।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মান্দেব। সৌদি আরব এই পথ ব্যবহার করে এশিয়ায় তেল রপ্তানি করে। হরমুজ খোলা থাকলে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশও সুয়েজ খাল অথবা মিসরের লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত সুয়েজ-ভূমধ্যসাগরীয় পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে তেল ও গ্যাস পাঠায়।
২০২৪ সালে এই প্রণালি দিয়ে প্রায় ৪১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য পরিবহন হয়েছে, যা বৈশ্বিক মোট পরিবহনের পাঁচ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—দুটি প্রণালিই একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২৫ শতাংশ বা এক-চতুর্থাংশ বাধাগ্রস্ত হবে।
শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। চীন, ভারত এবং এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে ইউরোপে যাওয়া বিপুল পরিমাণ পণ্যবাহী জাহাজও এই প্রণালি ব্যবহার করে।
হরমুজে চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সৌদি আরব এখন পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে আবকাইক তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থেকে ইয়ানবু বন্দরে তেল নিয়ে এসে সেখান থেকে বাব আল-মান্দেব হয়ে রপ্তানি করছে। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন পরিচালনা করে দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো।
জ্বালানি তথ্যপ্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে সাত লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল এই পাইপলাইনে পরিবাহিত হলেও মার্চে হরমুজ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিবহন দ্রুত বাড়ানো হয়। মার্চের শেষ দিকে পাইপলাইনটি দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা হয়, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
বাব আল-মান্দেব বন্ধ করার সক্ষমতা হুথিরা আগেও দেখিয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালে তারা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। ধারাবাহিক হামলার কারণে অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান ওই পথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি কমাতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও হুথিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলে প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া হয়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যেও হুথিরা আবারও এই জলপথে অস্থিরতা তৈরির ইঙ্গিত দিয়েছে। মার্চের শেষ থেকে ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ৮ জুন হুথিরা জানায়, তারা আবারও ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং ইসরায়েলি জাহাজের জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপপ্রধান কূটনীতিক নাবিল খুরি এর আগে আল জাজিরাকে বলেন, হুথিদের প্রকৃত শক্তি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নয়, বরং বাব আল-মান্দেব বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতায়। তার ভাষায়, ‘তাদের শুধু কয়েকটি জাহাজে হামলা চালালেই লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল থেমে যাবে। সেটি হবে এক লাল রেখা, এরপর খুব দ্রুতই ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা দেখা যাবে।’
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্টন কলেজের সভাপতি ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কেন্ডাল আল জাজিরাকে বলেন, হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও বিধিনিষেধ আরোপ হলে পরিস্থিতি হবে ‘দুঃস্বপ্নের মতো’। তার মতে, এতে ইউরোপমুখী বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত, এমনকি প্রায় অচল হয়ে যেতে পারে।
তবে কেন্ডাল মনে করেন, এটি হুথিদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সৌদি আরব বা আরও বড় ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া উসকে দিতে তারা হয়তো শেষ পর্যন্ত এমন পদক্ষেপ নিতে চাইবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা
/অ