দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পুরোনো ছবি দেখে গাজার কৃষক আবু ফারেস স্মরণ করেন শেখ ইজলিন এলাকার সেই দিনগুলোর কথা, যখন এলাকাটি আঙুরলতা, ডুমুরগাছ ও মৌসুমি ফসলের জন্য পরিচিত ছিল। তবে এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজা সিটি ও এর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও ভূমি উচ্ছেদের কারণে একসময়ের উর্বর কৃষিজমি পরিণত হয়েছে অনুর্বর প্রান্তরে। কৃষিনির্ভর হাজারো পরিবারের জীবিকার ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে।
গাজার বাস্তুচ্যুত কৃষকদের জন্য এই ধ্বংস এক দ্বিমুখী মানবিক সংকট তৈরি করেছে। একদিকে তারা হারিয়েছেন ঘরবাড়ি, অন্যদিকে হারিয়েছেন একমাত্র আয়ের উৎস। একই সঙ্গে কৃষি উপকরণ প্রবেশে বাধার কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যা দুই মিলিয়নের বেশি ফিলিস্তিনির খাদ্য সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও চরম সংকটের কারণে এখন অনেক বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি তাঁবুর আশপাশের ছোট ছোট মাটির অংশকে ক্ষুদ্র বাগানে পরিণত করছেন। সেখানে তারা টমেটো, বেগুন, মরিচ ও মুলুখিয়া শাকসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন।
এক বাস্তুচ্যুত কৃষক জানান, এতিম শিশুদের নিয়ে থাকা তার পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে তিনি তাঁবুর পাশের ছোট জমিতেই এসব ফসল ফলাচ্ছেন।
ধ্বংস হয়ে যাওয়া কৃষিভূমি
পানি, বীজ ও সার সংকটের মধ্যেও আবু মোহাম্মদের মতো কৃষকেরা মাটি চাষ করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে কৃষিকাজ শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার একটি উপায়।
গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি উপকরণের অভাব, সেচব্যবস্থার ধ্বংস এবং মাঠে কাজ করা কৃষকদের ওপর হামলার কারণে চাষযোগ্য জমির উৎপাদন সক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থার ১৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
সাবেক কৃষিজমিতে ফিরে যাওয়া অনেক ফিলিস্তিনির জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি বাহিনী বিস্তীর্ণ কৃষিজমিকে তাদের নিয়ন্ত্রিত ‘হলুদ রেখা’র আওতাভুক্ত করেছে, ফলে গোলাবর্ষণের ঝুঁকির কারণে এসব এলাকায় প্রবেশ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে তাঁবুর পাশে ছোট জমিতে চাষ করাই অনেক কৃষকের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাদ্যনির্ভরতা তৈরির অভিযোগ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি খাতের এই ধ্বংস শুধু যুদ্ধের স্বাভাবিক ফল নয়, বরং একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আঞ্চলিক নীতি উপদেষ্টা ফাদেল আল-জুবি বলেন, গাজার খাদ্যব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত করা হয়েছে। তিনি জানান, কূপ, সেচব্যবস্থা, ফসল সংরক্ষণাগার ও দীর্ঘমেয়াদি গাছ ধ্বংসের ফলে মানুষের টিকে থাকার উপাদানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
গাজার সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগে কৃষি খাত সেখানকার অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং পাঁচ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষের জীবিকার সহায়ক ছিল। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার উপমহাপরিচালক বেথ বেচডল সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনহাউস ও কূপ ধ্বংসের কারণে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যা দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
কৃষিখাতে বিপর্যয়ের চিত্র
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং জাতিসংঘের উপগ্রহ কেন্দ্রের ২০২৫ সালের মে মাসের মূল্যায়নে দেখা যায়, গাজার মোট কৃষিজমির ৫ শতাংশেরও কম অংশ চাষের জন্য ব্যবহারযোগ্য ছিল।
অক্টোবরে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা জানায়, অধিকাংশ কৃষিজমি ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গাজার এক লাখ ৭৮ হাজার দুনাম কৃষিজমির ৯৪ শতাংশের বেশি ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে বার্ষিক কৃষি উৎপাদন চার লাখ পাঁচ হাজার টন থেকে কমে ২৮ হাজার টনে নেমে এসেছে।
পুরো গাজাজুড়ে প্রায় ৪০ লাখ ফলের গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬ লাখ জলপাই গাছ রয়েছে। এসব গাছ পুনরায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি কৃষির ৮৭ শতাংশ কূপ এবং ৮৫ শতাংশ গ্রিনহাউস ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। কৃষি ও পশুসম্পদ খাতে সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
এই ধ্বংস হওয়া কৃষি ব্যবস্থা পুনর্গঠনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। গত বছর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কৃষকদের বীজ, পশুখাদ্য, সেচ সরঞ্জাম ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ দিতে ৭৫ মিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা চেয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত এর ১০ শতাংশেরও কম অর্থ পাওয়া গেছে।
অর্থের সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি সত্ত্বেও গাজার কৃষকেরা ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভূমিকে আবার জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের আশা, একদিন আবারও কৃষিই হয়ে উঠবে বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
/অ