দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনকে ঘিরে বহু রহস্যের মধ্যে অন্যতম তার মায়ের পরিচয়। ক্ষমতায় আসার ১৫ বছরেও তিনি প্রকাশ্যে একবারও মায়ের নাম উচ্চারণ করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার বৈধতা এবং কিম পরিবারের বংশপরিচয় নিয়ে সংবেদনশীল বাস্তবতা।
উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করা হয় ‘পেক্তু পর্বতের রক্তধারা’। দেশটির প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, চীন-উত্তর কোরিয়া সীমান্তে অবস্থিত পেক্তু পর্বতেই জন্ম হয়েছিল কোরীয় জাতির পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতা দানগুনের। পরে উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং জাপানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় এই পর্বতকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রচার করা হয়। একইভাবে দাবি করা হয়, তার ছেলে কিম জং ইলের জন্মও এই পর্বতে, যদিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার জন্ম সম্ভবত রাশিয়ায় হয়েছিল।
নির্বাসিত উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিউ হিউন উ তার বইয়ে লিখেছেন, কিম জং উন তরুণ বয়সেই শুধু ‘পেক্তু রক্তধারা’র কারণেই উত্তরসূরি হন, ব্যক্তিগত কোনো অর্জনের জন্য নয়।
তবে কিমের মাতৃপরিচয়ের ইতিহাস সেই প্রচারিত বর্ণনার সঙ্গে মেলে না।
জানা যায়, কিমের মা কো ইয়ং হুই ১৯৫২ সালে জাপানের ওসাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা-মায়ের আদি বাড়ি ছিল বর্তমান দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে। জাপানে বসবাসকারী কোরীয় বংশোদ্ভূত পরিবার হিসেবে তারা পরিচিত ছিলেন। পরে কো ইয়ং হুই প্রায় ১০ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ায় চলে আসেন।
১৯৫৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে প্রায় ৯৩ হাজার কোরীয় নাগরিক পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় জাপান থেকে উত্তর কোরিয়ায় যান। শুরুতে তাদের সঙ্গে অর্থ, পোশাক ও গৃহস্থালি সামগ্রী আসায় অনেকে ঈর্ষা করলেও পরে বিদেশি মতাদর্শে প্রভাবিত বলে তাদের অবজ্ঞাসূচক নামে ডাকা হতো।
উত্তর কোরিয়ার সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থায় এই গোষ্ঠীকে মধ্যবর্তী বা ‘দোদুল্যমান’ শ্রেণিতে রাখা হয়। তারা কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকতেন এবং ভালো বিশ্ববিদ্যালয় বা চাকরির সুযোগ থেকেও প্রায়ই বঞ্চিত হতেন।
উত্তর কোরিয়া গবেষণা সংস্থার কিম হিউং সু বলেন, ‘পেক্তু রক্তধারা’কে পবিত্র হিসেবে দেখা হয়। তাই দেশের সর্বোচ্চ নেতা এমন একটি পরিবারের সন্তান—এমন ধারণা কল্পনাতীত।
তবে কো ইয়ং হুইয়ের জীবন অন্যদের মতো ছিল না। তিনি অভিজাত শিল্পীদলের সদস্য ছিলেন। জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমির ভাষ্য অনুযায়ী, তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও নৃত্যশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে কিম জং ইল তার প্রতি আকৃষ্ট হন।
তখন কিম জং ইলের সরকারি স্ত্রী ছিলেন উচ্চপদস্থ এক সামরিক কর্মকর্তার মেয়ে কিম ইয়ং সুক। এছাড়া তার আরও দুই নারীসঙ্গী ছিলেন। তবু কো ইয়ং হুইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তাদের তিন সন্তান জন্ম নেয়।
উত্তর কোরিয়ায় বিবাহবহির্ভূত সন্তানদের সামাজিকভাবে নেতিবাচক চোখে দেখা হয়। এ কারণে সরকারি স্ত্রী রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে থাকলেও কো ইয়ং হুই ও তার সন্তানদের প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরের উপকূলীয় শহর ওনসানে রাখা হয়েছিল।
কো ইয়ং হুই কখনও কিম জং ইলকে বিয়ে করেননি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সম্পর্কের স্বীকৃতিও দেওয়া হয়নি। নির্বাসিত কূটনীতিক রিউ হিউন উর মতে, উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং কখনও তাকে পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। এমনকি তাকে বা তার সন্তানদের সঙ্গে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
সেজং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক চিয়ং সুং চাংয়ের মতে, যদি কিম ইল সুং তাকে স্বীকৃতি দিতেন, তাহলে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে তার ছবি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচার করা হতো।
কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর পর কিম জং ইল দেশের সর্বোচ্চ নেতা হন। এরপর কো ইয়ং হুই কার্যত দেশের প্রথম নারী হিসেবে তার সঙ্গে বিভিন্ন সফর ও সামরিক পরিদর্শনে অংশ নেন। কিম জং ইল নীতিনির্ধারণের আগেও তার মতামত নিতেন বলে সাবেক ব্যক্তিগত রাঁধুনি ফুজিমোতো লিখেছেন।
২০১১ সালে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে কো ইয়ং হুইকে কিম জং ইলের সফরসঙ্গী হিসেবে দেখানো হলেও তার নাম বা সামাজিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। পরে এটি সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে গেলে কর্তৃপক্ষ দ্রুত তা প্রত্যাহার করে নেয়।
২০০৪ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের একটি হাসপাতালে স্তন ক্যানসারে মারা যান কো ইয়ং হুই। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করেনি।
এরপর প্রশ্ন ওঠে, কীভাবে কিম জং ইলের সবচেয়ে ছোট ছেলেদের একজন কিম জং উন উত্তরসূরি হলেন।
সরকারি স্ত্রী কিম ইয়ং সুকের দুটি সন্তানই কন্যা হওয়ায় তারা উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হননি। অন্য নারীসঙ্গী সুং হে রিমের ছেলে কিম জং নামকে একসময় সম্ভাব্য উত্তরসূরি মনে করা হলেও উত্তরাধিকারভিত্তিক শাসনের সমালোচনা এবং সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তিনি কিম জং ইলের আস্থা হারান। পরে তিনি দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় স্নায়ুবিষ প্রয়োগে নিহত হন।
আরেক ভাই কিম জং চুল মাদকাসক্তির কারণে উত্তরসূরির তালিকা থেকে বাদ পড়েন বলে দাবি করেছেন রিউ হিউন উ।
এরপর কো ইয়ং হুই নিজের দ্বিতীয় ছেলে কিম জং উনকে উত্তরসূরি করার উদ্যোগ নেন। বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে কিম জং উন দ্রুত বাবার আস্থা অর্জন করেন। ২০১১ সালে কিম জং ইলের মৃত্যুর পর ২৭ বছর বয়সে তিনি দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
বর্তমানে কিম জং উন তার বোন কিম ইয়ো জংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয়ের মতে, তিনি উত্তর কোরিয়ার প্রভাবশালী প্রচার বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মায়ের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক এড়াতেই কিম জং উনের জন্মদিন এখনও রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়নি, যদিও তার বাবা ও দাদার জন্মদিন জাতীয়ভাবে পালন করা হয়। কারণ তার জন্ম নিয়ে আলোচনা শুরু হলে মায়ের পরিচয় এবং কেন তিনি রাজধানীর বাইরে বড় হয়েছেন, সেই প্রশ্নও সামনে চলে আসতে পারে।
একই কারণে তিনি শুরু থেকেই স্ত্রী রি সল জু ও মেয়ে জু এইকে প্রকাশ্যে আনেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রি সল জু পিয়ংইয়ংয়ের উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং শৈশবে চীনে সংগীতের শিক্ষা নিয়েছিলেন।
জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমির মতে, মায়ের পরিচয় নিয়ে যে বৈধতার সংকটে কিম জং উন বড় হয়েছেন, সেটিই তাকে স্ত্রী ও মেয়েকে দ্রুত জনসমক্ষে আনতে উৎসাহিত করেছে।
নির্বাসিত কূটনীতিক রিউ হিউন উর দাবি, যদি কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয় যে কিম জং উনের মা জাপানে জন্ম নেওয়া কোরীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন, তাহলে তা শুধু তার শাসনের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে না, উত্তর কোরিয়ার উত্তরাধিকারভিত্তিক পুরো শাসনব্যবস্থাকেও গভীর সংকটে ফেলতে পারে।
/অ