দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন, যার মাধ্যমে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের অবসানের পথ তৈরি হয়েছে।
তবে ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকে কী রয়েছে এবং কী নেই, তা নিয়ে ইতোমধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিয়ে নতুন এই সমঝোতাকে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
২০১৫ সালে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই চুক্তির আওতায় ইরানকে সর্বোচ্চ ৩০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের অনুমতি দেওয়া হয় এবং ১৫ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে তদারকির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছিল, ২০১৮ সালে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার আগ পর্যন্ত ইরান শর্ত মেনে চলছিল। তবে চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল বলে জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। এই মাত্রার ইউরেনিয়াম তুলনামূলক দ্রুত অস্ত্রমানের পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব।
নতুন সমঝোতা স্মারকে ইরান পুনরায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার করেছে। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নির্ধারণ করবে।
এদিকে ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার কথা বললেও নতুন সমঝোতা স্মারকে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কোনো উল্লেখ নেই। বরং সম্প্রতি তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর কাছে ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে ইরানের ক্ষেত্রেও তা না থাকা অন্যায্য হবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও নতুন সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালের চুক্তিতে নতুন অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি না থাকলেও ইরানের কিছু জব্দ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
একই সঙ্গে চুক্তি সইয়ের পরপরই ইরানের অপরিশোধিত তেল, জ্বালানি পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন কার্যক্রমে ছাড় দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এসব সুবিধা পেতে ইরানকে অতিরিক্ত কোনো শর্ত পূরণের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সহযোগিতায় ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা তৈরির কথাও সমঝোতা স্মারকে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির বিষয়েও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। তবে সংঘাত শুরু হওয়ার পর সেই সংখ্যা নেমে আসে দৈনিক গড়ে ছয়ে।
নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করবে। অন্যদিকে ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের চার্জ ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে।
তবে এরপর হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে ইরান। ইতোমধ্যে তেহরান প্রণালিটি পরিচালনার জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। এছাড়া ইরান জানিয়েছে, সরাসরি যাতায়াত কর আরোপ না করা হলেও প্রদত্ত সেবার বিনিময়ে নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের চুক্তির তুলনায় নতুন সমঝোতা অনেক কম বিস্তারিত। তবে এটি পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার ভিত্তি তৈরি করেছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক প্রভাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
/অ