দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

চীনের সামরিক বাহিনী গত বছরের শেষ দিকে গোপনে প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং তাদের একটি অংশ পরে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছে ইউরোপের তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা। রয়টার্সের হাতে আসা নথিতেও এ তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।
ইউক্রেনে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে চীন ও রাশিয়া একাধিক যৌথ সামরিক মহড়া চালালেও বেইজিং বরাবরই নিজেদের নিরপেক্ষ দাবি করে আসছে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও উপস্থাপন করেছে।
তবে রয়টার্সের দেখা রুশ-চীনা দ্বিভাষিক এক চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ জুলাই বেইজিংয়ে দুই দেশের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত সমঝোতার আওতায় চীনে এসব গোপন প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রশিক্ষণের মূল বিষয় ছিল ড্রোন ব্যবহার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং আধুনিক যুদ্ধ কৌশল।
চুক্তিতে বলা হয়, প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে বেইজিং ও নানজিংসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। একইসঙ্গে কয়েকশ চীনা সেনাও রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ নেবে।
ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একজন বলেন, ‘চীন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িত। কারণ তারা এমন রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যারা পরে যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নিয়েছে।’
যদিও রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইউক্রেন সংকটে তারা ‘বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ অবস্থান’ বজায় রেখেছে এবং শান্তি আলোচনার পক্ষে কাজ করছে। তারা আরও অভিযোগ করে, কিছু পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। উভয় পক্ষই দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে শত শত কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি বিস্ফোরক বহনকারী ছোট এফপিভি ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করেছে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্স জানায়, চীনের বেসরকারি কিছু কোম্পানির বিশেষজ্ঞরা রাশিয়ার ড্রোন নির্মাতাদের সঙ্গে সামরিক ড্রোন প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করেছেন। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
প্রশিক্ষণ চুক্তি অনুযায়ী, রুশ সেনাদের ড্রোন পরিচালনা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, সেনা বিমান চলাচল এবং সাঁজোয়া পদাতিক কৌশলে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চুক্তিতে সফরগুলোর বিষয়ে কোনো ধরনের গণমাধ্যম কভারেজ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তৃতীয় পক্ষকে অবহিত না করার নির্দেশ ছিল।
দুটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, চীনা সেনাদের রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ সফর অন্তত ২০২৪ সাল থেকে চললেও রুশ সেনাদের চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার ঘটনা নতুন।
তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার বাস্তব যুদ্ধ অভিজ্ঞতা থাকলেও চীনের উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি—বিশেষ করে ফ্লাইট সিমুলেটর—রুশ বাহিনীর জন্য বড় সহায়তা হয়ে উঠেছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করেছে, তারা এমন কয়েকজন রুশ সেনার পরিচয় নিশ্চিত করেছে, যারা চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ইউক্রেনের দখলকৃত ক্রিমিয়া ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে ড্রোন যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেয়। তাদের মধ্যে জুনিয়র সার্জেন্ট থেকে শুরু করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তাও ছিলেন।
রয়টার্সের হাতে আসা রুশ সামরিক নথিতে এসব সেনার নামও পাওয়া গেছে। যদিও তাদের পরবর্তী যুদ্ধ অংশগ্রহণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রুশ সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কয়েকটি প্রতিবেদনে প্রশিক্ষণের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, শিজিয়াঝুয়াংয়ের পিএলএ গ্রাউন্ড ফোর্সেস ইনফ্যান্ট্রি একাডেমিতে প্রায় ৫০ রুশ সেনাকে সম্মিলিত যুদ্ধ কৌশল শেখানো হয়। সেখানে ড্রোনের সাহায্যে লক্ষ্য শনাক্ত করে ৮২ মিলিমিটার মর্টার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
আরেকটি প্রশিক্ষণে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ রাইফেল, ড্রোন প্রতিরোধী জাল নিক্ষেপ যন্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশল শেখানো হয়।
ডিসেম্বর ২০২৫ সালের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইবিন শহরের পিএলএ সামরিক বিমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রুশ সেনাদের ফ্লাইট সিমুলেটর ব্যবহার ও বিভিন্ন ধরনের এফপিভি ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এছাড়া নানজিং ইউনিভার্সিটি অব মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিস্ফোরক প্রযুক্তি, মাইন স্থাপন ও অপসারণ এবং অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয় করার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গে থাকা ছবিতে চীনা সামরিক প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে ইউনিফর্ম পরিহিত রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ নিতে দেখা গেছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/