দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান ও হিজবুল্লাহর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের অভাবনীয় নির্ভুলতা দেখে বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন প্রশ্ন উঠেছে—ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস বর্জন করে চীনের শক্তিশালী স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা ‘বেইডু’ ব্যবহার করছে?
গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত লক্ষ্যভেদের পেছনে বেইডু সিস্টেমের বড় ভূমিকা থাকতে পারে।
ফ্রান্সের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএসই–এর সাবেক পরিচালক আলাইন জুইলেট এক পডকাস্টে বলেন, গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ অনেক বেশি নিখুঁত হয়েছে। তার ভাষায়, ‘আট মাস আগের তুলনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের এই উন্নতি নির্দেশিকা ব্যবস্থাকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন তুলছে। সম্ভবত ইরানকে চীনের বেইডু সিস্টেমে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে।’
২০২০ সালে চীন তাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা ‘বিডিএস’ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস ব্যবস্থায় ২৪টি স্যাটেলাইট রয়েছে, সেখানে চীনের বেইডু নেটওয়ার্কে স্যাটেলাইটের সংখ্যা প্রায় ৪৫টি। এই সিস্টেম কেবল অবস্থান নির্ধারণই নয়, সামরিক ব্যবহারের জন্য এনক্রিপ্ট করা সংকেতও সরবরাহ করে, যা জ্যাম করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করা হয়।
বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার ও থিও নেনসিনির মতে, ইরান আগে মূলত জড়ীয় নেভিগেশন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করত। এতে দীর্ঘ দূরত্বে সামান্য ত্রুটি জমা হয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকত। কিন্তু বেইডু ব্যবহারের ফলে কয়েকটি বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমত বেইডুর সামরিক স্তরের সংকেত জ্যামিং বা ‘স্পুফিং’ প্রতিরোধে অনেক বেশি সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে জিপিএসের বেসামরিক সংকেত বন্ধ বা জ্যাম করতে পারে, কিন্তু বেইডু–৩ এর বি৩এ সংকেতকে তুলনামূলকভাবে অজেয় বলে বিবেচনা করা হয়।
দ্বিতীয়ত, বেইডু ব্যবহারের ফলে লক্ষ্যবস্তুর ত্রুটির মাত্রা ১ মিটারেরও কমে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, এই সিস্টেমের মাধ্যমে উড্ডয়নরত অবস্থায়ও দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনকে নতুন নির্দেশনা পাঠানো কিংবা লক্ষ্য পরিবর্তন করার সুযোগ থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকেও এই ধরনের নির্দেশনা পাঠানো সম্ভব।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ইরান ২০১৫ সালেই বেইডু ব্যবহারের বিষয়ে চীনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। ২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি হওয়ার পর এই সহযোগিতা আরও গতি পায়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের মধ্যে ইরান ধীরে ধীরে সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে জিপিএস নির্ভরতা কমিয়ে বেইডু ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি সত্যিই বেইডু ব্যবহার করে থাকে, তবে তা যুদ্ধক্ষেত্রে স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও জিপিএসের বিকল্প প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতে পারে।
বর্তমানে ইরানের হাতে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আলাইন জুইলেটের মতে, ‘ইরান ফ্রান্সের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বড় একটি ভূখণ্ডজুড়ে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে রেখেছে এবং সেগুলোর অনেকগুলোই ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে স্থাপন করা। ফলে এত বড় এলাকায় সেগুলো শনাক্ত বা ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন।’
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের একটি উদ্বেগ হলো, ইরানের তুলনামূলক সস্তা ‘শাহেদ’ ড্রোন প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এমএস/