দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে দ্রুত বাড়ছে নিহতদের সংখ্যা। হাসপাতালগুলোতে দেখা যাচ্ছে লাশের সারি। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের বিরুদ্ধে পাল্টা বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে। এ বিক্ষোভকে তারা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে এবং সেই অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনী বল প্রয়োগ করছে বলে দাবি তাদের।
গতকাল সোমবার পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৬৪৮ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলছে, সাড়ে ১০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ইরান।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়, ইরানের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে অনেক মানুষকে তাদের স্বজনদের লাশ শনাক্ত করার দৃশ্য দেখা গেছে। একটি ভিডিওতে দেশটির কাহরিজাক ফরেনসিক মেডিকেল সেন্টার এবং এর বাইরে কালো ব্যাগে ঢাকা লাশের সারি দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিটিজ নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, প্রায় ২৫০টি লাশ শুধু এই এক মেডিক্যাল সেন্টারেই রয়েছে।
সিএনএন জানায়, ভিডিওতে দেখা যায়— একটি মনিটরের সামনে অনেক মানুষ জমায়েত হয়েছে, যেখানে মৃত ব্যক্তিদের ছবি দেখাচ্ছে এবং তাদের স্বজনরা শনাক্তের চেষ্টা করছেন।
আরেকটি ক্লিপে দেখা যায়, ফরেনসিক কেন্দ্রের বাইরে লাশের কালো ব্যাগগুলো সারি করে রাখা হয়েছে এবং তার চারপাশে ভিড় করছে মানুষ। কিছু লাশ প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে আছে, আবার কিছু মাটিতে পড়ে আছে। কিছু মাত্র কয়েক ফুট দূরে পার্ক করা গাড়ির পাশে রয়েছে, যেখানে পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, লাশ এত বেশি আনা হয়েছে যে— প্রাঙ্গণেও তাদের রাখা হচ্ছে।
অবশ্য ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা লাশের ঘটনা স্বীকার করলেও সরকারবিরোধীদের দায়ী করেছে। তাদের দাবি, এটি ‘সাধারণ মানুষের’ মৃত্যুর ফল।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি ফরেনসিক কেন্দ্রের আশপাশের দৃশ্যের ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভিডিওতে দেখা যায়, নিহতের পরিবারের সদস্যরা রিপোর্টারকে জানাচ্ছেন— তাদের স্বজনরা বিক্ষোভকারী ছিলেন না।
এক ব্যক্তি লাশের কালো ব্যাগের পাশে বসে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে বলছেন, ‘তার স্বজন সরকারপন্থী ছিলেন, এক অজ্ঞাত ব্যক্তি তার মাথায় আঘাত করে।’
ওই প্রতিবেদনের ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, যারা ‘নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ জড়াতে চেয়েছিল’ বা ‘সেনা ঘাঁটি দখল করতে চেয়েছিল এবং হয়তো অস্ত্র ব্যবহার করেছে’ তারাও নিহত হয়েছেন। কিন্তু ‘অধিকাংশ মানুষ সাধারণ মানুষ এবং তাদের পরিবার সাধারণ পরিবার’ ছিলেন।
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী ও মানবাধিকার সংস্থা বলছে, বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী ভয়ঙ্কর সহিংসতা চালিয়েছে। দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী সিএনএনকে বলেছেন, ‘শুক্রবার রাতে তারা সেনাবাহিনীর অস্ত্র দিয়ে অনেক মানুষ হত্যা করেছে।’
একজন সমাজকর্মী বলেছেন, এক বিক্ষোভে তিনি দেখেছেন— পুলিশ একজন মেয়ের গলায় টেসার ব্যবহার করেছে, যার ফলে সে অচেতন হয়ে গেছে।
সিএনএন বলছে, মূলত এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে ইরানের সরকার বিক্ষোভকারীদের দোষারোপ করছে এবং অন্যদের প্রতিবাদে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে চাইছে।
তবে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ইতিহাসে যে নিপীড়ন চালিয়েছে এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যা ঘটছে, মানবাধিকার সংস্থার মতে, ‘সরকারের দাবির বিরুদ্ধে প্রমাণ বেশি।’
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর মাইকেল পেজ বলেছেন, ‘ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু ও আহত হওয়ার জন্য দায়ী।’
ইরানের সরকার অবশ্য শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, বড় ধরনের বিক্ষোভকে তারা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে এবং সেই অনুযায়ী বাহিনীকে বল প্রয়োগ করতে বলেছেন।
কিন্তু বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা সহিংসতার ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা সেই দাবি ভিত্তিহীন প্রমাণিত করছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ডিসেম্বরের শেষ থেকে বিক্ষোভে ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে নয়জন শিশু। ১০ হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়েছে। তবে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে প্রকৃত সংখ্যা অজানা।
ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারের প্রতিক্রিয়া কঠোর হলেও, চোখে দেখা এবং ভিডিওর প্রমাণ বলছে, বিক্ষোভ দমন ও প্রাণহানিকর পদক্ষেপ মানুষের জন্য বাস্তব বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। কাহরিজাকের ফরেনসিক মেডিকেল সেন্টারের ভিডিও প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরছে।
এবি/