দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিকে ঘিরে ন্যাটো জোট বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র দখল করতে পারে—এমন আশঙ্কা ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ ন্যাটো এমন একটি সামরিক জোট, যেখানে এক সদস্যের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে ধরা হয়। সেই জোটেই এখন শঙ্কা তৈরি হয়েছে, এক সদস্য আরেক সদস্যকে আক্রমণ করতে পারে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা স্টিফেন মিলার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি পরাশক্তি এবং পরাশক্তির মতো করেই তারা আচরণ করবে।
যদিও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা কমানোর চেষ্টা করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে, তবু ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রে সামরিক হামলা চালায়, তাহলে ন্যাটো কার্যত ভেঙে পড়বে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা শেষ হয়ে যাবে।
তবে ইউরোপের অন্য নেতারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে খুব একটা কথা বলছেন না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইউরোপের জন্য অপরিহার্য মিত্র। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার মোকাবিলায় ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইউরোপের সামনে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে—গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে ঠেকানো যাবে, আবার ইউক্রেন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সমর্থনও কীভাবে ধরে রাখা যাবে।
এই টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউক্রেন-সমর্থক দেশগুলোর এক বৈঠকে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ ৩৫টি দেশের প্রতিনিধিরা যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক সফল হলেও সংবাদ সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ইউরোপীয় নেতারা তা এড়িয়ে যান। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শুধু ডেনমার্কের প্রতি সংহতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও সরাসরি কোনো সমালোচনা করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে চাইলেও বাস্তবে তাদের হাতে তেমন শক্তি নেই। ইউরোপীয় নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপ নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে তুলতে এখনো তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।
তবে কেউ কেউ মনে করেন, ইউরোপ পুরোপুরি অসহায় নয়। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ড্যানিয়েল ফ্রিড বলেছেন, প্রতিরক্ষা শিল্পে ইউরোপেরও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আছে এবং কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। আবার ফরাসি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য রাফায়েল গ্লুকসম্যান গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মাজদা রুগে মনে করেন, লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়ানো নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ট্রাম্পকে একতরফা সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বড় অংশই গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিরোধী। এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এ ধরনের পদক্ষেপ সমর্থন করেন।
সব মিলিয়ে ইউরোপের অনেক নেতা আশঙ্কা করছেন, এবার গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ আগের মতো সহজে থামবে না। এক ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা বলেছেন, এখন সবাই বুঝতে পারছে, বিষয়টি কল্পনা নয়—ট্রাম্প এ বিষয়ে খুবই সিরিয়াস। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের সামনে এখন মূল লক্ষ্য সময় কেনা—যতদিন না তারা নিজেরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে, ততদিন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গেই চলতে হবে।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/