দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদ থেকে শুরু হয়ে ইরানে চলমান বিক্ষোভ এখন স্পষ্টভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ জনের অধিক নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে।
এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের এক শীতল সকালে জোমহুরি অ্যাভিনিউসংলগ্ন এই বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রতিবাদ জানিয়ে হঠাৎ করে তাদের দোকান বন্ধ করে দেন। ক্রমাগত মূল্যহ্রাস পাওয়া জাতীয় মুদ্রা রিয়ালই ছিল তাদের ক্ষোভের মূল কারণ।
গত এক বছরে ইরানি রিয়াল তার মূল্যের প্রায় অর্ধেক হারিয়েছে। ফলে প্রতিদিন লোকসানের মুখে পড়ছিলেন ব্যবসায়ীরা। সেই আর্থিক চাপই প্রথমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়, যা দ্রুতই রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
তেহরান থেকে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে যায় পশ্চিম ইরানের আজনা, মালেকশাহি ও কেরমানশাহ শহরে। পরে দক্ষিণাঞ্চলের মারভদাশত এবং মধ্য ইরানের ফুলাদশাহসহ আরও কয়েকটি শহরে আন্দোলন দানা বাঁধে। অনেক জায়গায় বিক্ষোভ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে প্রাণহানি, আহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি-এর বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, এই অস্থিরতায় অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী ও চারজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি ইরানের শিয়া ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার প্রতি দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশার প্রতিফলন। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাটানকা বলেন, ‘পতন শুধু রিয়ালের নয়, জনগণের আস্থারও।’
বিক্ষোভ চলাকালে বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট দেখা যায়, যা শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত ছিল বলে জানিয়েছে ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস। একই সময়ে বিদেশ থেকে আন্দোলনে সমর্থন ও বিক্ষোভের আহ্বান জানান ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি।
সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে। একদিকে বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক দাবিতে হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বৈধ এবং সংলাপের মাধ্যমে তা সমাধান করা হবে। অন্যদিকে, বেশ কয়েকটি শহরে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার ও কঠোর নিরাপত্তা অভিযান চালানো হয়েছে।
এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ তরুণ পুরুষ, যা মাহসা আমিনিকে কেন্দ্র করে হওয়া আগের আন্দোলনের তুলনায় ভিন্ন। তখন নারী ও কিশোরীদের ভূমিকা ছিল বেশি।
পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশত শহর থেকে ২৫ বছর বয়সী মিনা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি শুধু শান্ত, স্বাভাবিক জীবন চাই। কিন্তু শাসকেরা পারমাণবিক কর্মসূচি, বিদেশি সংঘাতে জড়ানো আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।’
তার ভাষায়, ‘এই নীতিগুলো হয়তো ১৯৭৯ সালে অর্থবহ ছিল, কিন্তু আজ নয়। পৃথিবী বদলে গেছে।’
এক সাবেক সংস্কারপন্থী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল আদর্শিক স্তম্ভগুলো—হিজাব বাধ্যতামূলক করা থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি—৩০ বছরের কম বয়সী তরুণদের কাছে আর গ্রহণযোগ্য নয়। এই বয়সী জনগোষ্ঠীই মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
আমিনি আন্দোলনের সময় যে হিজাব বড় ইস্যু ছিল, বর্তমানে তার প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে শিথিল দেখা যাচ্ছে। বহু ইরানি নারী প্রকাশ্যে হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীরা ইরানের আঞ্চলিক সামরিক সম্পৃক্ততার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের স্লোগান— ‘গাজা নয়, লেবানন নয়—আমার জীবন ইরানের জন্য।’
রয়টার্স যাচাই করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদে বিক্ষোভকারীরা একটি বড় ইরানি পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলছে—যা রাষ্ট্রীয় প্রতীকের প্রতিও ক্ষোভের ইঙ্গিত দেয়।
ইসলামি বিপ্লবের প্রায় পাঁচ দশক পর এসে ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখন তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা ও নিজেদের আদর্শিক অবস্থানের মধ্যকার ব্যবধান কমাতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আর সেই টানাপোড়েনের সূচনা হয়েছিল ঠিক তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকেই।
এবি/