দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইসরায়েলের দীর্ঘ যুদ্ধের পর গাজা উপত্যকায় দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ভয়াবহ মাত্রায় বেড়েছে। ঘরবাড়ি ধ্বংস, কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং তীব্র খাদ্যসংকটে সেখানে মানবিক পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে।
মধ্য গাজা শহরের একটি জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলে ছোট একটি তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন আলা আলজানিন। স্ত্রী, পাঁচ সন্তান, ৭১ বছর বয়সী মা ও এক বোনকে নিয়ে তিনি সেখানে থাকছেন। ইসরায়েলের হামলায় বেইত হানুনে নিজের বাড়ি হারানোর পর আটবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তারা। এখন এই তাঁবুতেই বৃষ্টি ও শীত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন।
৪১ বছর বয়সী আলজানিন একজন দিনমজুর ছিলেন। অবকাঠামো ও কৃষি খাতে কাজ করে তিনি পরিবার চালাতেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর তিনি বেকার। তার মতো গাজাজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ এখন কাজহীন। তিনি বলেন, ‘এখন আমার কোনো কাজ নেই। পরিবার চালানোর মতো আয়ও নেই।’
একই অবস্থা উত্তর গাজার জাবালিয়ার বাসিন্দা মাজেদ হামুদার। ৫৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি পোলিও আক্রান্ত, তার স্ত্রী থ্যালাসেমিয়ার বাহক। পাঁচ সন্তান নিয়ে তিনি রেমাল এলাকার একটি স্কুল ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারেন না। আগে সরকারি সহায়তা পেতেন, কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর সেই সহায়তাও বন্ধ হয়ে গেছে।
হামুদা বলেন, ‘আমরা যেন জীবিত মৃত। ঘর ভেঙে আমাদের রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় আমাদের কিছুই খাওয়ার থাকে না।’ কোনো কোনো দিন খাবারের জোগাড় করতে তিনি তার একমাত্র ছেলেকে রাস্তায় প্লাস্টিক ও আবর্জনা কুড়িয়ে বিক্রি করতে পাঠান।
তার ছেলে ইয়াকুব একসময় স্কুলে মেধাবী ছাত্র ছিল। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালে বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছিল। এখন সেই শিশুকেই খাবারের আশায় ক্যাম্পে দৌড়াতে দেখা যায়। হামুদা বলেন, ‘টমেটো বা শসা খাওয়াটাও এখন স্বপ্নের মতো। এটা অমানবিক।’
দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে গাজা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, গাজায় ঢোকা ত্রাণ মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খাদ্যসামগ্রী প্রবেশ করছে।
ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে ফিলিস্তিনে বেকারত্বের হার বেড়ে ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গাজায় এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার অর্থনীতি অন্তত ২২ বছরের অগ্রগতি হারিয়েছে। মাথাপিছু আয় নেমে এসেছে বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি।
গাজার ব্যবসায়ীরা জানান, যুদ্ধের আগে সেখানে বাণিজ্য, পর্যটন ও শিল্প খাতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি ছিল। কিন্তু এখন ২০২৪ সালে গাজার জিডিপি আগের বছরের তুলনায় ৮৩ শতাংশ কমেছে।
গাজা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোসহ প্রায় ৯০ শতাংশ খাত ধ্বংস হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে অর্থনীতি পুনর্গঠন ও কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও তা নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতি, সীমান্ত খুলে দেওয়া এবং কাঁচামাল প্রবেশের ওপর।
আলা আলজানিনের স্ত্রী মারিয়াম তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ক্যাম্পে মাঝে মাঝে খাবার পেলেও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে ভুগছেন তিনি। মারিয়াম বলেন, ‘আমরা খাবার খাই ঠিকই, কিন্তু সেটা শরীরের জন্য যথেষ্ট নয়। সন্তানদের ফল, মাছ বা ডিম কিনে দিতে পারি না। আমি গর্ভবতী, ভালো খাবার দরকার, কিন্তু তা জোটে না।’
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও ক্ষুধার এই ভয়াবহ সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানো।
সূত্র- আল জাজিরা
এমএস/