দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

গাজার হাজারো মানুষের জীবন এখনো ঝুলে আছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। নাসের হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পড়ে আছে অসংখ্য শিশু ও রোগী—তাদের মধ্যে রয়েছে দুই ১০ বছরের শিশু। একজন ইসরায়েলি গুলিতে ঘাড় থেকে নিচ পর্যন্ত পঙ্গু, আরেকজনের মস্তিষ্কে টিউমার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বর্তমানে গাজায় প্রায় ১৫ হাজার রোগী জরুরি চিকিৎসার জন্য বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে এদের বেশিরভাগই আটকে আছে মৃত্যুর মুখে।
দক্ষিণ গাজার এক তাঁবুতে বসে নিজের সন্তান আমারের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ওলা আবু সাঈদ। পরিবারটির দাবি, ইসরায়েলি ড্রোনের গুলিতে আমার আহত হয় এবং গুলি তার মেরুদণ্ডের দুই হাড়ের মাঝে আটকে আছে, ফলে সে সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। ওলা বলেন, ‘আমার ছেলেটার তাড়াতাড়ি অস্ত্রোপচার দরকার। কিন্তু এখানে সম্ভব না। ডাক্তাররা বলেছেন, অস্ত্রোপচারে তার মৃত্যু বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে। ভালোভাবে সজ্জিত হাসপাতালে তার চিকিৎসা দরকার।’
গাজার হাসপাতালগুলো এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে। দুই বছরের যুদ্ধের ধাক্কায় চিকিৎসা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। একই হাসপাতালে আহমদ আল-জাদ নামের আরেক শিশুর পাশে বসে কাঁদছেন তার বোন শাহদ। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইটা মাত্র ১০ বছর বয়সে আমাদের জন্য পানি বিক্রি করে সংসারে সাহায্য করত। কয়েক মাস আগে তার মুখ একদিকে বেঁকে যেতে শুরু করে, হাতও নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তাররা বলেছেন, মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে।’
শাহদ বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে আমাদের বাবা, ঘরবাড়ি আর স্বপ্ন হারিয়েছি—এখন ভাইকেও হারাতে চাই না। যুদ্ধবিরতির খবরটা আমাদের সামান্য আশার আলো দিয়েছে, হয়তো এক শতাংশ সম্ভাবনা আছে যে আহমদ চিকিৎসা নিতে বিদেশে যেতে পারবে।’
ডব্লিউএইচও গত বুধবার যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো ৪১ রোগী ও ১৪৫ জন স্বজনকে ইসরায়েলের কেরেম শালোম সীমান্ত দিয়ে জর্ডানে পাঠিয়েছে। সংস্থাটি দ্রুত আরও বেশি সংখ্যক রোগীকে বিদেশে নেওয়ার অনুমতি চেয়েছে। তবে ইসরায়েল জানিয়েছে, হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত পূরণ করে নিহত জিম্মিদের দেহ ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত রাফা সীমান্ত খুলবে না।
ডব্লিউএইচও প্রধান ড. টেড্রস আধানম গেব্রেইয়েসুস বলেছেন, ‘সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হবে যদি ইসরায়েল গাজার রোগীদের পশ্চিম তীরের পূর্ব জেরুজালেমসহ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার সুযোগ দেয়, যেমনটা যুদ্ধের আগে হতো।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ২০টিরও বেশি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কর্মকর্তারা এ প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে চিকিৎসক, সরঞ্জাম ও অর্থসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অগাস্টা ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী ড. ফাদি আতরাশ বলেন, ‘জেরুজালেমের হাসপাতালগুলো প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০ জন ক্যান্সার ও রেডিয়েশন রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারে। অন্যান্য হাসপাতালেও অস্ত্রোপচার সম্ভব। গাজা থেকে এখানে রোগী পাঠানোই সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকর উপায়।’
কিন্তু ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা দপ্তর (কগাট) বলেছে, সীমান্ত খোলার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পর্যায়ের বিষয়, এবং তারা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছে—যেখান থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখিয়ে গাজার রোগীদের পশ্চিম তীরে যেতে দেয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ৭৪০ রোগী, যাদের মধ্যে ১৪০ শিশু, চিকিৎসার অপেক্ষায় মারা গেছে।
নাসের হাসপাতালের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ড. আহমেদ আল-ফাররা বলেন, ‘ডাক্তার হিসেবে রোগ নির্ণয় করতে পারি, কিন্তু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা চিকিৎসা দিতে পারি না—এটাই সবচেয়ে কষ্টের বিষয়। প্রতিদিনই আমরা রোগী হারাচ্ছি শুধু সীমাবদ্ধতার কারণে।’
সম্প্রতি হাসপাতালেই মারা গেছে ৮ বছরের সাদি আবু তাহা (ক্যান্সারে), পরদিন মারা যায় তিন বছরের জাইন তাফেশ ও ৮ বছরের লুয়াই দোয়িক (হেপাটাইটিসে)।
যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, আরও অনেক গাজাবাসী বাঁচার সুযোগ হারাবে—শান্তিতে বেঁচে থাকার সেই ক্ষীণ আশাটুকুও।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/