দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে গভীর নজর রাখছেন ইরানিরা। কারণ, দুই দেশের নির্বাচনের ফল তাদের ভবিষ্যতের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আবারও শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কায় রয়েছেন অনেক ইরানি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে পারে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে দেশটির মানুষ বোমা হামলা, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন। জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা আবারও দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন কি না, তা নির্ধারণে ভোট দিয়েছেন দেশটির নাগরিকেরা। অন্যদিকে, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনের ফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ বছরগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তেহরানের ৩৭ বছর বয়সী বাসিন্দা সাজাদ আল জাজিরাকে বলেন, তিনি ইসরায়েলের নির্বাচন খুব একটা অনুসরণ করেননি। তবে নেতানিয়াহু, আইজেনকোট কিংবা অন্য কেউ ক্ষমতায় এলেও লড়াই চলতে পারে বলে মনে করেন তিনি। নিরাপত্তার কারণে নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান সাজাদ।
তার মতে, ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধের লক্ষ্য এখনো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ইরান শাসন করছে এই সরকার।
ইরানের ভেতরে ও বাইরে সরকারের বিরোধীদের কেউ কেউ এ লক্ষ্যকে সমর্থনও করেছেন। তবে ইসরায়েল ও ইরানের সাইবার গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে নেতানিয়াহু আবারও নির্বাচিত হলে অনলাইনে ইরানিদের প্রতিক্রিয়া নির্ভুলভাবে বোঝা কঠিন।
ইরানি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলপন্থী ইরানিদের ‘দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগে ইসরায়েলের সঙ্গে কথিত সহযোগিতার জন্য কঠোর শাস্তিও অব্যাহত রেখেছে তারা।
জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে হওয়া বিক্ষোভের জন্যও তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। ওই বিক্ষোভ দমনে হাজারো বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। জাতিসংঘের ভাষ্য, বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।
তেহরানের ৩২ বছর বয়সী বাসিন্দা শায়ান মনে করেন, যুদ্ধের শুরুতে ইরান সরকারের পতন চেয়েছিলেন—এমন কিছু মানুষও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড দেখে হতাশ হয়েছেন। তার ভাষ্য, হাজারো বেসামরিক মানুষের মৃত্যু এবং মার্কিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞায় মানুষের আয় কমে যাওয়ার ঘটনা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।
শায়ান আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু মন্তব্য এবং তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ইস্পাতের মতো মানুষের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোয় হামলার পর কারও কারও দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। তার মতে, অধিকাংশ ইরানির এ পরিস্থিতিতে তেমন কিছু করার সুযোগ নেই; তারা শুধু স্থিতিশীলতা ও শান্তি চান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে ‘একটি সভ্যতার মৃত্যু’ ঘটানোর হুমকি দিয়েছেন। যুদ্ধের পর দেশটির মানচিত্রও বদলে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
যুদ্ধ আবার শুরু হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা চালানোর হুমকিও বারবার দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দেশ দেওয়া হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
ট্রাম্পের আরেকটি হুমকি হলো, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ দীর্ঘায়িত করা। জুলাই থেকে চালু থাকা এ অবরোধে দেশটির তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে এবং বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত কঠোরতম নিষেধাজ্ঞাগুলোর সঙ্গে মার্কিন পদক্ষেপ ইরানিদের আরও দরিদ্র করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
নেতানিয়াহু সরকারও ইরানের জ্বালানি স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোয় আবারও হামলার হুমকি দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিকবার ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন।
নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিরোধী শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা—যাদের মধ্যে আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট, ইয়ার লাপিদ ও ইয়ার গোলান রয়েছেন—ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে সমর্থন করেছেন। চলমান যুদ্ধের পাশাপাশি গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও তারা এমন অবস্থান নিয়েছিলেন।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়ার বিষয়েও তারা একমত। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধিতাকারী তেহরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নির্মূল করাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে ইসরায়েলের সরকার ও বিরোধী রাজনীতিকদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য থাকলেও তা অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। আইজেনকোট, উদাহরণস্বরূপ, ইরানে নেতানিয়াহুর সামরিক হামলাকে সমর্থন করেছেন এবং হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ট্রাম্পের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তবে তার মতে, শুধু সামরিক অভিযান চালিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো বাস্তবসম্মত নয়; পরিবর্তন আনতে হবে ইরানিদেরই।
নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সংঘাত শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কায় কিছু ইরানি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দেশটির কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, আকাশে যুদ্ধবিমান উড়তে শুনলে আসন্ন হামলার বিষয়ে একে অপরকে সতর্ক করতে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা বন্ধুদের নিয়ে দল গঠন করেছেন।
কিছু দল স্থানীয় মেসেজিং অ্যাপ ও খুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থায় আরও বিধিনিষেধ আরোপের কথা জানিয়েছে।
আলি নামের এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “সত্যি বলতে, ৯ কোটি মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি—কখন যুদ্ধ শুরু হবে তা দেখার জন্য। কী অভিশপ্ত জীবন কাটাচ্ছি আমরা।”
সূত্র: আল জাজিরা
এমএস/