দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইসরায়েলের সঙ্গে আবারও সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কায় গত তিন মাস ধরে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এ জন্য ইরান থেকে নতুন করে বিপুল অর্থ পেয়েছে গোষ্ঠীটি। হিজবুল্লাহর কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত লেবাননের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
১৯৮২ সালে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হিজবুল্লাহ ২০২৪ সাল থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে দুই দফা যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। এসব সংঘাতে গোষ্ঠীটির হাজারো যোদ্ধা ও বহু নেতা নিহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে তাদের অস্ত্রভান্ডারের বড় অংশও।
বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকটি গ্রামে ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান করছে। একই সঙ্গে রাজধানী বৈরুতে গোষ্ঠীটিকে নিরস্ত্র করার দাবিতে রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে।
তবে এসব ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে রয়েছে হিজবুল্লাহ। লেবাননের দুই নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, জুন থেকে সংঘাতের তীব্রতা কমে আসার সুযোগে অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে মনোযোগ দিয়েছে গোষ্ঠীটি। বিশেষ করে বিস্ফোরক সংগ্রহ এবং ইসরায়েলি অবস্থান লক্ষ্য করে উড়তে সক্ষম ড্রোন তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এক নিরাপত্তা সূত্র এবং হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ আরেক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ইরান থেকে কয়েক কোটি ডলার পেয়েছে গোষ্ঠীটি। এর বাইরে, চলতি মাসের শুরুর দিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দক্ষিণ লেবাননের শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে সহায়তার জন্য তেহরান থেকে প্রায় ২০ কোটি ডলার পেয়েছে হিজবুল্লাহ।
গোষ্ঠীটির কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত এক সূত্র ও আরও তিন নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুদ্ধে ভেঙে পড়া কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পুনর্গঠনের কাজও চলছে।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে হিজবুল্লাহর গণমাধ্যম কার্যালয় বলেছে, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা তাদের বৈধ অধিকার। তবে তাদের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে গোষ্ঠীটি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জেনেভায় জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী মিশনও রয়টার্সের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর অর্থায়ন বন্ধে চাপ অব্যাহত রাখবে ওয়াশিংটন। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের দাবি, ইরানের অর্থের পরিমাণ এবং অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ—দুটিই কমে আসছে।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহর এই প্রস্তুতি চলছে।
ইরানের সমর্থনে ২ মার্চ ইসরায়েলের ওপর হামলা শুরু করে হিজবুল্লাহ। এর জবাবে লেবাননে অভিযান চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এতে চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন এবং লেবাননের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়। বাস্তুচ্যুতদের অধিকাংশই হিজবুল্লাহর সমর্থক শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য।
গ্রীষ্মকালে সংঘাত অনেকটা কমে আসে। ওই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতায় লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা ভেঙে পড়লেও লেবাননে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আবার শুরু হয়নি। তবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়লে লেবাননেও নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে হিজবুল্লাহ।
রয়টার্সকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, গোষ্ঠীটি এখনো তাদের অস্ত্রের মজুত এবং যোদ্ধাদের পুরোপুরি প্রস্তুত করতে পারেনি।
অস্ত্রভান্ডার পুনরায় পূর্ণ করার কাজও চলছে। চলতি মাসে লেবাননের কর্তৃপক্ষের জব্দ করা কিছু বিস্ফোরকের মালিকানা স্বীকার করেছে হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য এসব বিস্ফোরক রাখা হয়েছিল। হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তা ও লেবাননের এক নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে বলেছেন, বিস্ফোরকগুলো বিশেষভাবে বিস্ফোরকবাহী ড্রোনে ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।
লেবাননের এক নিরাপত্তা সূত্র এবং আরও তিন নিরাপত্তা কর্মকর্তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রণক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির কারণে হিজবুল্লাহকে তাদের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও মেরামত করতে হবে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র বিনত জবেইল শহর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলী আল-তাহের পাহাড়ি এলাকা।
তাঁদের ভাষ্য, ছোট ছোট দলে অভিযান চালানো এবং ট্যাংকবিধ্বংসী রকেট ব্যবহারে রাশ টানার কৌশলের কারণে কিছু এলাকায় হিজবুল্লাহর ইউনিটগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ফলে দূর থেকে পরিচালিত ইসরায়েলি সামরিক প্রযুক্তির মোকাবিলা করতে তাদের বেগ পেতে হয়। এসব প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে অস্ত্রসজ্জিত ড্রোন ও দূরনিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র যান।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রয়টার্সকে জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে নজরদারি চালানো এবং সেনাদের ঝুঁকি কমাতে তারা দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তাতে হিজবুল্লাহ সরাসরি অংশ নেবে কি না, তা স্পষ্ট করে জানায়নি গোষ্ঠীটি। তবে তাদের গণমাধ্যম কার্যালয় বলেছে, লেবাননে সংঘাত বাড়ানোর অজুহাত ইসরায়েলি নেতাদের হাতে তুলে দিতে চায় না তারা। বিশেষ করে, নতুন করে হামলা শুরু হলে নিজেদের সমর্থক জনগোষ্ঠীর মানুষ আবারও বাস্তুচ্যুত হতে পারেন—এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হিজবুল্লাহ।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/