দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করার কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক কমান্ডাররা দাবি করছেন, নতুন অস্ত্রের বড় মজুত গড়ে তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সতর্ক করে তেহরান বলছে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে এবার আরও বিস্তৃত পরিসরে হামলা চালানো হতে পারে।
গত এক মাসে ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে এমন বার্তা দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র আবারও হামলা শুরু করলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে ইরান। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডেটা সেন্টার এবং আঞ্চলিক তেল-গ্যাস স্থাপনাও রয়েছে।
গত মাসের শেষ দিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, বিশ্ব অবাক হবে। এখনো হামলা চালানো হয়নি—এমন নতুন লক্ষ্যবস্তু তাদের হাতে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, যুদ্ধ শেষ হয়নি এবং আইআরজিসি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার প্রায় নয় মাস পরও সংঘাত কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেহরান নিজেদের টিকে থাকাকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন দাবি করছে, তাদের হামলায় ইরানের শাসনব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে ট্রাম্প প্রশাসন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের বিভিন্ন পথ খতিয়ে দেখছে।
ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা প্রস্তুতির কথা বললেও দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আতঙ্ক বাড়ছে। দীর্ঘদিনের সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁরা আবারও সম্ভাব্য বোমা হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
গত সপ্তাহে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তেহরানের ৭০ বছর বয়সী এক বাসিন্দা জানান, প্রতিদিনই তাঁরা নতুন করে বোমা হামলা শুরুর আশঙ্কা করছেন। তিনি বলেন, সব পাওয়ার ব্যাংক চার্জ দিয়ে রেখেছেন, পানি মজুত করেছেন এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রস্তুত রেখেছেন। যেকোনো দিন, যেকোনো মুহূর্তে হামলা শুরু হতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
দুই সন্তানের এক মা জানান, প্রতিদিন সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সময় তাঁর মধ্যে ভয় কাজ করে। রাস্তায় আইআরজিসির সদস্যদের উপস্থিতি এবং সক্রিয় সামরিক ঘাঁটি দেখে উদ্বেগ আরও বাড়ে। তাঁর প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র আর কী বোমা ফেলতে চায়? ইরানের নেতৃত্বকে সরাতে পারেনি, আলোচনার মাধ্যমেও সমাধান হয়নি—তাহলে আবার যুদ্ধ শুরুর উদ্দেশ্য কী?
তেহরানের আরেক বাসিন্দা সিএনএনকে বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু হবে—এমন ধারণা মানুষের মধ্যে দৃঢ় হয়েছে। বিষয়টি এখন সবার আলোচনার কেন্দ্রে। রাতে হামলা হবে, নাকি পরদিন—এই উদ্বেগ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে। নিরাপত্তার কারণে সাক্ষাৎকার দেওয়া ইরানিরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান নিয়ে সম্ভাব্য পদক্ষেপ পর্যালোচনা করতে গত কয়েক সপ্তাহে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টারা বৈঠক করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি নতুন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। তবে একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে সিএনএনকে জানিয়েছেন, এ বক্তব্য চূড়ান্ত কি না, তা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সম্ভাব্য অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বোমা, যা ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা। এমন হামলা সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
তবে ইরানের সেনা কর্মকর্তা আলিরেজা শেখি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের হুমকি ইরানিদের ভয় দেখানোর প্রচারণার অংশ। তাঁর বক্তব্য, ইরানের জনগণই প্রকৃত শক্তির প্রতীক।
অন্যদিকে ইরান এমন এক সামরিক কৌশলের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেখানে হামলার শিকার হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগাম আঘাত হানার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হতে পারে। গত সপ্তাহে আইআরজিসির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোতে দেশজুড়ে সামরিক মহড়ার খবর প্রকাশ করা হয়। ওই মহড়ায় একসঙ্গে ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ফারজিন নাদিমি বলেন, ইরান যদি নতুন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে যুক্তরাজ্যে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি কিংবা জার্মানির রামস্টাইন ঘাঁটি সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে। তবে তাঁর মতে, এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা হবে সংঘাতের অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের বিস্তার।
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্যে মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব দূরপাল্লার বোমারু বিমান নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। কর্মকর্তারা জানান, নতুন একটি অজ্ঞাত হুমকির পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাজ্য সরকার ওই বিমানগুলো অবস্থান করছিল যে বিমানঘাঁটিতে, সেটিকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য ইরানি ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
নাদিমির মতে, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াতে ইরান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সক্ষম ড্রোনের আরও সমন্বিত বহর তৈরির চেষ্টা করতে পারে। ক্যামেরা ও ডেটা-লিংকযুক্ত এসব ড্রোন পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ, গতিপথ ও গতি পরিবর্তন এবং জ্যামিং ও আকাশ প্রতিরক্ষা এড়িয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তবে ইরান এখনো এ ধরনের সক্ষমতা প্রদর্শন করেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়া দেশটি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং সামরিক যোগাযোগ ও নজরদারি স্যাটেলাইটে বিঘ্ন ঘটানোর প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপরিচালক আলি ওয়ায়েজ সিএনএনকে বলেন, ইরান একদিকে নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য হামলার মূল্য সম্পর্কে সতর্ক করে নিরুৎসাহিত করতে চাইছে। তবে তেহরানের এই বার্তাকে ওয়াশিংটন উসকানি হিসেবে ব্যাখ্যা করলে যুদ্ধ এড়ানোর বদলে সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির সামরিক কমান্ডার, শীর্ষ কর্মকর্তা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। নিহতদের মধ্যে স্কুলশিশুও ছিল। এর জবাবে ইরান প্রধানত আরব প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালায়। তেহরানের অভিযোগ, এসব দেশ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন শহরের বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালায়। দুবাইয়ের মতো পর্যটনকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু হয়, কুয়েতের পানিশোধন স্থাপনায় আঘাত হানা হয় এবং কয়েকটি দেশের ডেটা সেন্টারে হামলার কারণে ব্যাংকিং সেবায় বিঘ্ন ঘটে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান শুধু আমিরাতকে লক্ষ্য করেই আড়াই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যা ইসরায়েলসহ অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। আবুধাবি প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে পেরেছে বলে দাবি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
গত সপ্তাহে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজায়ি সতর্ক করে বলেন, নতুন করে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন স্থাপনা, এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভেতরে থাকা লক্ষ্যবস্তুও ইরানের হামলার আওতায় আসতে পারে। তাঁর ভাষ্য, নতুন যুদ্ধ শুরু হলে অঞ্চলজুড়ে সমুদ্রতলের কেবল, ডেটা সেন্টার, এআই স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান আলি আল-নুয়াইমি বলেছেন, তাঁর দেশ যুদ্ধ চায় না। কিন্তু সংঘাত শুরু হলে আগের তুলনায় যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় তারা বেশি প্রস্তুত। জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/