দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এবার রাজপথে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভের ডাক দেয় বিরোধী দলগুলো ও তরুণদের রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ স্লোগানে যন্তর মন্তরে বড় সমাবেশের পরিকল্পনা থাকলেও অনুমতি না পাওয়ায় তা আর হয়ে ওঠেনি। দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, বিরোধী রাজনীতিক, আন্দোলনকর্মী, সাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতাসহ প্রায় ছয় হাজার মানুষকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিরোধীদের দাবি, বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
উড়োজাহাজে আটক সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা
শনিবার সকালে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে আটক করে পুলিশ। তাঁর সঙ্গে দলটির নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয়।
টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিওতে দীপকেকে বলতে শোনা যায়, তিনি গ্রেপ্তার হতে এসেছেন এবং পুলিশকে ভয় পান না। তবে পুলিশের বক্তব্য, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি; সহযোগিতার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ধ্রুব রাঠি ও নেহা বোরাকে আটক
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে গুরুগ্রামের বাসা থেকে আটক করা হয়। সিজেপির আন্দোলনে অংশ নিতে তিনি তিন দিন আগে জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন।
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক নেহা বোরাকেও আটক করা হয়। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আটকের তালিকায় সাবেক মুখ্যমন্ত্রীরাও
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে একাধিক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী নেতাকে আটক করা হয়। যন্তর মন্তর থেকে কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে আটক করা হয়। নিজের বাসার সামনে থেকে আটক হন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। পরে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দিল্লিতে আটক করা হয়। মমতা ও কেজরিওয়ালকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সিপিআই(এম)-এর এম এ বেবি, রাজ্যসভার সদস্য জন ব্রিটাসসহ আরও কয়েকজন বাম নেতাকেও আটক করা হয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, চণ্ডীগড়ে আটক করা হয় দিল্লির সাবেক উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে।
মুম্বাইয়েও ধরপাকড়
মুম্বাইয়ে সংহতি কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে আটক হন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী। একই শহরে সিজেপির প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে আটক করা হয় অভিনেতা ইমরান খানকে। আজাদ ময়দানের কাছে পুলিশের অভিযানে আটক প্রায় ৪০০ বিক্ষোভকারীর মধ্যে তিনিও ছিলেন।
৩৫ হাজার নিরাপত্তাকর্মী, ব্যারিকেডে ঘেরা রাজধানী
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে প্রায় ৩৫ হাজার পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় বসানো হয় কয়েক স্তরের ব্যারিকেড। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রাজধানীতে প্রবেশের পথেও চলে তল্লাশি।
কড়া নিরাপত্তার কারণে আন্দোলনকারীরা যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে পারেননি। তবে কনট প্লেস, রাজীব চক, দিল্লি হাট ও মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধের আশপাশে ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়। কয়েকটি স্থানে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে, কোথাও আটক করা হয় তাঁদের।
মেট্রো-ট্রেনে বিধিনিষেধ, বন্ধ ইন্টারনেট
নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রভাব পড়ে দিল্লির পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থায়। রাজধানীর প্রায় ৪৫টি মেট্রোস্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বাতিল করা হয় বেশ কিছু ট্রেনযাত্রা, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে চলাচলও সীমিত রাখা হয়।
এ ছাড়া জনপথ-কর্তব্যপথের সংযোগস্থলের আশপাশের নির্দিষ্ট এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। রয়টার্সের এক সাংবাদিককে সাময়িকভাবে আটক করা হয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও কয়েকজন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী আটকের খবর প্রকাশ করেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে এসআইআর
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। বিরোধীদের দাবি, তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এতে বহু মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। এ কারণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন তাঁরা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, যাচাইপ্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটার, একাধিকবার তালিকাভুক্ত ব্যক্তি এবং যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাঁদের নাম রয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, কোনো যোগ্য ভোটারের নাম ভুল করে বাদ পড়লে তিনি পুনরায় নিবন্ধনের আবেদন করতে পারবেন।
বিরোধীরা অবশ্য বলছে, দীর্ঘ আপিলপ্রক্রিয়া ও নাম বাদ দেওয়ার কারণে বহু মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। অন্যদিকে, বিজেপির দাবি, বিরোধীরা বৈধ নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সিজেপি ৭ অক্টোবর বিক্ষোভের অনুমতি চেয়েছিল। পুলিশের দাবি, যন্তর মন্তরে বড় সমাবেশের জন্য অন্তত ১০ দিন আগে আবেদন করতে হয়।
দিন শেষে যন্তর মন্তরে বড় জমায়েত না হলেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, ব্যাপক আটক এবং পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এমএস/