দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর পর লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে।
সোমবার বিকেলে সৌদি বিমান হামলার সহায়তায় লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর মোকা দখলের দাবিও করে ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী। তবে পরে ইয়েমেন সরকারের ও সামরিক বাহিনীর কয়েকটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপিকে জানায়, সরকারি বাহিনী এখনো শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছেছে। শহরটি পুরোপুরি দখলের বিষয়টি তারা নিশ্চিত করেনি।
হুতিরা বাব আল-মান্দাব ও মোকা হারানোর দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সৌদি বিমান হামলার জবাবে তারা রিয়াদ বিমানবন্দরসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানায়, তারা ধুবাব সামরিক বিমানঘাঁটি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং ধুবাব এলাকা থেকে বাব আল-মান্দাবের দিকে যাওয়ার সড়ক বিচ্ছিন্ন করেছে। উপকূলীয় ওই এলাকা থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ধুবাব বিমানবন্দর দখলের পাশাপাশি কাছের শহরে অবস্থানরত হুতি যোদ্ধাদের ঘিরে ফেলারও দাবি করেছে তারা।
রয়টার্সকে চারটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, সোমবার রাতে ইয়েমেনি বাহিনী মোকা শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছায় এবং সেখানে থাকা হুতি যোদ্ধারা পিছু হটতে শুরু করেছে। তবে এএফপিকে সরকারি সামরিক সূত্রগুলো শহরটি পুরোপুরি দখলের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
হুতি নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে সংগঠনটির একটি সামরিক সূত্র সরকারি বাহিনীর দাবিকে সৌদি প্রচারণা হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছে, মোকা, ধুবাব, বাব আল-মান্দাব ও উপকূলের কাছের কাহবুব পর্বতমালা এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, সোমবার ইয়েমেনের অন্যান্য ফ্রন্টেও অভিযান শুরু হয়েছে। রাজধানী সানাসহ বিভিন্ন এলাকায় সামরিক তৎপরতা চলছে। ১২ বছর আগে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর সানা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধবিমান সরকারি বাহিনীকে সার্বক্ষণিক বিমান সহায়তা দিচ্ছে। অভিযান শুরুর পর থেকে ৩২৪টি উচ্চমূল্যের লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছে জোটটি।
তবে হুতি নিয়ন্ত্রিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের দাবি, সোমবার সানার সানহান ও সাওয়ান এলাকায় সৌদি বিমান হামলায় এক স্কুলছাত্রী ও এক নারী নিহত হয়েছেন। হুতিদের মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুল সালাম সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানোর অভিযোগ করেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সৌদি আরবের ওপর হুতিদের আন্তঃসীমান্ত হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইয়েমেনে লড়াইয়ের তীব্রতা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
এর আগে রোববার ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি হুতিদের দখলে থাকা অঞ্চল পুনরুদ্ধারে ‘অপারেশন ইয়েমেন ডন’ নামে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, উত্তেজনা কমানোর সব সুযোগ শেষ হয়ে গেছে এবং হুতিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত না করা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।
এর আগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ শহরের কাছে একটি পাহাড়ি সড়ক কেটে দিয়ে হুতিরা সরকারি বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কার্যত অবরুদ্ধ করে বলে অভিযোগ ওঠে।
জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের রিয়াদ ও খুরাইস এলাকায় সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে। তাদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আরামকোর একটি তেল শোধনাগার ও আবহা বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। বিবিসি ভেরিফাইয়ের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণেও রিয়াদ ও খুরাইসের দুটি স্থাপনার কাছে হামলার পর ধোঁয়া ওঠার চিত্র পাওয়া গেছে।
ইয়েমেনে ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সে সময় হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে উৎখাত করে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত আরও তীব্র হয়।
চার বছর ধরে চলা একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি জুলাইয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করে। এরপর হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধ ঘোষণা করে এবং দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে থাকা ট্যাংকার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। হুতিরা দাবি করে, সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের বন্দর ও বিমানবন্দরে অবরোধ আরোপ এবং সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালানোর কারণে তারা এসব হামলা করছে।
গত মাসে লোহিত সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলজুড়ে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে হুতিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের মোকা, ধুবাব ও পেরিম দ্বীপসহ কয়েকটি এলাকা থেকে সরকারি বাহিনীকে সরিয়ে দেয় বলে দাবি করা হয়।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ঘটনায় বৈশ্বিক তেলের বাজারেও প্রভাব পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
ইয়েমেন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত ৬ আগস্ট থেকে দেশটিতে চলমান লড়াইয়ে অন্তত ৯৫৯ জন নিহত ও ৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। জাতিসংঘ জানিয়েছে, সংঘাতের কারণে আরও প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/