দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরান-সমর্থিত হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইয়েমেনের সব এলাকা পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার।
রোববার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি বলেন, হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত না করা পর্যন্ত সরকারি বাহিনীর সামরিক অভিযান চলবে। পরে দেশটির সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র হুথিদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান।
আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত হুথিরা ২০১৪ সাল থেকে রাজধানী সানা এবং দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ওই অঞ্চলে ইয়েমেনের অধিকাংশ মানুষ বসবাস করেন। গত কয়েক বছরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের একাধিক হামলা সত্ত্বেও হুথিদের পরাস্ত করা যায়নি। ইরানের সহায়তায় গোষ্ঠীটি তাদের অস্ত্র সক্ষমতাও বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত মাসে আকস্মিক অভিযানে হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং লোহিত সাগরের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উপকূল দখল করে নেয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই পথে তাদের প্রভাব বেড়েছে।
এদিকে ইয়েমেন সরকার সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়ার সময় হুথিরা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর রিয়াদ ও খুরাইস এলাকার স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। হামলায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের কথাও জানিয়েছে তারা।
হুথিরা দাবি করেছে, ইয়েমেনে গত ১২ ঘণ্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ৫০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে তারা এসব হামলা চালিয়েছে। তবে সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে হুথিদের এই দাবি নিশ্চিত করেনি।
প্রেসিডেন্ট আল-আলিমি বলেন, সংঘাত কমানোর সব ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পাল্টা সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি ইয়েমেনকে সমর্থনের জন্য সৌদি আরবকে ধন্যবাদ জানান এবং আঞ্চলিক মিত্র ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সরকারি বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
এর আগে রয়টার্সকে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সৌদি আরব ও তাদের ইয়েমেনি মিত্ররা হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৌদি বাহিনী আকাশপথে হামলা এবং ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী স্থলপথে অভিযান চালাতে পারে।
ইয়েমেনে চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর যুদ্ধেরও নতুন একটি ফ্রন্ট তৈরি করেছে। সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ সৌদি আরবকে মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে।
২০১১ সালের আরব বসন্তের গণআন্দোলনের পর ইয়েমেনে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। পরবর্তী সময়ে জাইদি শিয়া মতাবলম্বী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি) দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে এবং এডেনকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে।
২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আরব জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে পিএলসিকে সমর্থন দেয়। তবে দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পরও হুথিদের পরাস্ত করা সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হয়, যা চলতি বছর পর্যন্ত অনেকাংশে কার্যকর ছিল।
গত মাসে বাব আল-মান্দাব প্রণালি দখলের পর ইয়েমেনে স্থলযুদ্ধে হুথিরাই উদ্যোগ ধরে রেখেছে বলে সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই প্রণালি ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ায় চলতি বছর এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
গত ৪৮ ঘণ্টায় ইয়েমেনের তাইজ শহরের কাছে কৌশলগত পাহাড়ি অবস্থানগুলোতেও হুথিরা সরকারি ও স্থানীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে সামরিক সূত্র জানিয়েছে। তারা তাইজ ও দক্ষিণ উপকূলের এডেনের মধ্যে থাকা শেষ সড়কটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তাইজ-এডেন সড়কটি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। শহরটিতে কয়েক লাখ বেসামরিক মানুষ এবং হাজারো সরকারি সেনা অবস্থান করছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাত বৃদ্ধির প্রভাবে ইয়েমেনের কিছু এলাকায় প্রতি চারটি পরিবারের তিনটি পরিবার খাদ্যসংকটে রয়েছে। সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং লাখো মানুষের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/