দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

উত্তর ইথিওপিয়ায় নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে ইরিত্রিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে ইথিওপিয়া। এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইথিওপিয়া জানায়, ইরিত্রিয়ার রাজধানী আসমারায় থাকা দেশটির দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ ইরিত্রীয় কূটনীতিককে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর জবাবে ইরিত্রিয়াও ইথিওপিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইথিওপিয়ার সিদ্ধান্তের পর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেছে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কয়েক ঘণ্টা আগে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় রাতভর বেশ কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর মধ্যে দেশটির সামরিক সদর দপ্তরের কাছাকাছি এলাকাও ছিল।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের টাইগ্রে, আফার ও আমহারা অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) ও তাদের মিত্রদের লড়াই চলছে। ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়ার বিরুদ্ধে নতুন একটি বিদ্রোহী জোটকে সমর্থনের অভিযোগ করেছে। তবে আসমারা এ অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে।
ইথিওপিয়া আরও এক মিসরীয় কূটনীতিককে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে তাকে বহিষ্কারের কারণ সরকার প্রকাশ্যে জানায়নি। এর জবাবে মিসরও একই সময়ের মধ্যে ইথিওপিয়ার দূতাবাসের একজন কর্মকর্তাকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আল কাহেরা নিউজ জানিয়েছে।
ইথিওপিয়া ও মিসরের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। এর অন্যতম প্রধান কারণ নীল নদের ওপর ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম (জিইআরডি) প্রকল্প। নীল নদের পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল মিসর এই বাঁধের কারণে দেশটির পানির হিস্যায় সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইথিওপিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের ঘটনা ২০১৮ সালের পরিস্থিতির সম্পূর্ণ বিপরীত। ওই বছর প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ দুই দশকের বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেন। সীমান্ত খুলে দেওয়া হলে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা পরিবারগুলো পুনরায় একত্রিত হয়। এই সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগের জন্য ২০১৯ সালে আবি আহমেদ নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
২০২২ সালে টাইগ্রে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উত্তর ইথিওপিয়ায় বর্তমান সংঘাতই সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি বলে মনে করা হচ্ছে। দুই বছর ধরে চলা ওই যুদ্ধে প্রায় ৬ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল বলে এর আগে আফ্রিকান ইউনিয়নের এক মধ্যস্থতাকারী অনুমান করেছিলেন।
গত মাসে টিপিএলএফ আমহারা অঞ্চলের ফানো মিলিশিয়াসহ আরও ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে একটি জোট গঠন করে। জোটটির ঘোষিত লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো।
তবে টাইগ্রেতে সরকারি বাহিনীর পক্ষে লড়াই করা এক মিলিশিয়া কমান্ডার বিবিসিকে দাবি করেছেন, ইরিত্রিয়ার সেনারাও যুদ্ধের সম্মুখসারিতে অংশ নিয়েছে। তবে বিবিসি এ দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। টাইগ্রেতে বিবিসির সরাসরি প্রবেশাধিকার নেই এবং অঞ্চলটিতে ইন্টারনেট সংযোগও বন্ধ রয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের আগে বিবিসিকে দেওয়া এক বিরল প্রতিক্রিয়ায় ইরিত্রিয়ার তথ্যমন্ত্রী ইয়েমানে গেব্রেমেসকেল টাইগ্রেতে দেশটির সামরিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইথিওপিয়ার ক্ষমতাসীন প্রসপারিটি পার্টি দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অন্যান্য সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে প্রতিবেশী দেশগুলোকে দায়ী করছে।
২০২০ থেকে ২০২২ সালের টাইগ্রে যুদ্ধে ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া মিত্র ছিল। সে সময় টিপিএলএফের বিরুদ্ধে ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করেছিল ইরিত্রিয়ার সেনারা। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। বিশেষ করে লোহিত সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকারের জন্য ইথিওপিয়ার প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ে।
১৯৯৩ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হওয়ার পর সমুদ্রপথে সরাসরি প্রবেশাধিকার হারায় ইথিওপিয়া। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ বারবার বলেছেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার স্বার্থে সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার জরুরি। অন্যদিকে ইরিত্রিয়া অভিযোগ করেছে, ইথিওপিয়া তাদের বন্দর নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করছে।
এদিকে সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা দক্ষিণ টাইগ্রেতে অগ্রগতি অর্জন করে আঞ্চলিক রাজধানী মেকেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। আলামাতায় তিন দিনের তীব্র লড়াইয়ে অন্তত ৫২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে চলতি সপ্তাহে এক চিকিৎসক বিবিসিকে জানিয়েছেন।
টিপিএলএফ প্রতিবেশী আফার অঞ্চলেও লড়াই করছে। অঞ্চলটি জিবুতি ও সমুদ্রের দিকে ইথিওপিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন করিডরের অংশ। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর জন্য ইথিওপিয়া সরকার ও টিপিএলএফ একে অপরকে দায়ী করছে। টাইগ্রের কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকারি বাহিনীর অভিযান ও ড্রোন হামলার জবাবেই তাদের বাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অন্যদিকে আদ্দিস আবাবার দাবি, টিপিএলএফ টাইগ্রেতে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বিমানবন্দরগুলো দখলের পর হামলা শুরু করেছে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া ও মিসরকে সংযত থাকার এবং কূটনৈতিক পথে মতপার্থক্য নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল করতে পারে এমন পদক্ষেপ না নেওয়ার সতর্কতা দিয়েছে সংস্থাটি।
জাতিসংঘও উত্তর ইথিওপিয়ার অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক বলেন, ড্রোন তৎপরতা ও বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতা ও সড়ক বন্ধ থাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/